প্রকাশিত: মার্চ ৩১, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর চার সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য বার বার পরিবর্তিত হয়েছে। তবে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রাথমিক লক্ষ্যের ব্যাপারে তিনি অটল ছিলেন—আর তা হলো ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে ধূলিসাৎ করা এবং এটি নিশ্চিত করা যে তেহরান যেন ‘কখনও পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায়’।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার লক্ষ্যও একই ছিল। এর এক মাস আগে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ (আইএইএ) জানিয়েছিল, ইরানের কাছে ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জমা রয়েছে, যা আরও পরিশোধনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ৯টি ওয়ারহেড বা ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
আইএইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের কাছে প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ মাত্রার ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল বা পারমাণবিক পদার্থ রয়েছে, যা খুব সহজেই ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতার সমরাস্ত্র-মানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আশঙ্কা অমূলক ছিল না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভাণ্ডারে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল ছিল—যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বৃহত্তম।
এছাড়া পুরো অঞ্চল জুড়ে তাদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ এর অধীনে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি হামলার কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরান ‘পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না’।
‘এটি অত্যন্ত সহজ। তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে আপনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখতে পারবেন না।’
কেন যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করতে পারে
বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনা ও বিজ্ঞানীদের ওপর হামলা, স্বল্পমেয়াদে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিঃসন্দেহে ধীর করে দেবে। কিন্তু এখন এই শাসনব্যবস্থা—যদি তারা যুদ্ধে টিকে থাকে, যার সব লক্ষণই দৃশ্যমান—নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে আরও বেশি সংকল্পবদ্ধ হবে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফোর্ড স্কুলের ‘সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন অ্যান্ড ডিজআর্মামেন্ট’-এর পরিচালক এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক রমেশ ঠাকুর টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছেন, ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রই এখন একমাত্র জিনিস যা তাদের শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেবে।
তাহলে তারা কেন এটি অর্জন করবে না?
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ ওই প্রকাশনাকে বলেছেন, যেহেতু মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের ব্যালেস্টিক মিসাইল অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই একটি পারমাণবিক বোমা এখন ‘প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দ্রুততম পথ হতে পারে এমন একটি শাসনের জন্য যা এখন আরও চরমপন্থী এবং আলোচনার মাঝপথেই দুবার আক্রান্ত হয়েছে।’
অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কি পারমাণবিক অস্ত্র?
কিন্তু এখন কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না; এটি সম্ভবত এমন এক ‘পারমাণবিক দানবকে’ বোতল থেকে বের করে আনবে যা পুনরায় বন্দি করা কঠিন হবে।
গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তার দেশ পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক ছিল। তিনি একে অপরিবর্তনীয় হিসেবে অভিহিত করেন এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাস ও আগ্রাসনের অভিযোগ তোলেন।
এই উত্তর কোরীয় নেতার কাছে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের পরিণতিও ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা। দুজনেই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করার পর ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর স্বেচ্ছায় পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করার জন্য ইউক্রেনও আজ নিঃসন্দেহে অনুতপ্ত। বিশ্ব এখন জানে যে প্রকৃত সংঘাতের সময় মার্কিন এবং সেই সূত্রে ইউরোপীয় নিরাপত্তা গ্যারান্টির মূল্য খুব সামান্যই। এই বার্তা আরও জোরালো হয় যখন ২০১৮ সালে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে সরে আসে। এটি এই বার্তাই স্পষ্ট করে দেয় যে, খামখেয়ালি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে আসা নিরর্থক, যেখানে যেকোনো প্রশাসন তার পূর্বসূরির দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে যেতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা, যারা ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কায় মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই সাজানো সংঘাতের শুরু থেকে ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাগতিক দেশের জনগণ বা অবকাঠামো রক্ষার পরিবর্তে নিজেদের সামরিক ঘাঁটিগুলো রক্ষা করা, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ এবং অর্থনীতিকে আরও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
রমেশ ঠাকুর টাইমকে বলেন, ইরান যদি বর্তমান আক্রমণ থেকে টিকে যায়, তবে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এটি সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সম্ভবত মিশরকেও নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্ররোচিত করবে।
তদুপরি, ইরান যুদ্ধ মার্কিন মিত্র এবং অন্যান্য নিরপেক্ষ দেশগুলোকেও তাদের নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি হোক বা ন্যাটোর সমালোচনা—ট্রাম্পের অপমানজনক মন্তব্যে ইউরোপ ইতোমধ্যে জর্জরিত। এটি মূলত রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি নতুন সুরক্ষা জোটের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে দাবি করেছে যে তারা প্রতিবেশী বেলারুশে পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়েছে।
আরও পূর্ব দিকে, ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের পর কোনো দেশই অদূর ভবিষ্যতে তাদের তৎপরতা কমাবে না। পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন; উত্তর কোরিয়ার আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং তাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসনের ওপর চীনের হুমকির ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা সেখানে পারমাণবিক বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে। তাইওয়ানের এক সময় পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের তা ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এখন তাইপে যদি পুনরায় পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা করে, তবে সেটি বেইজিংকে আক্রমণের এক সুবর্ণ সুযোগ করে দেবে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জনমত জরিপ দেখাচ্ছে যে, নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি জনগণের সমর্থন রেকর্ড ৭৬ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি কেবল মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভর করার ব্যাপারে তাদের উদ্বেগকে ফুটিয়ে তোলে।
সিউলের ট্রয় ইউনিভার্সিটির অ্যাডজান্ট প্রফেসর ড্যানিয়েল পিঙ্কস্টন টাইমকে বলেছেন, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল যে আমরা আপনাদের বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারব, তাই আপনাদের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই, কিন্তু এই প্রশাসন কোনো ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহী নয়।
এই তীব্র উদ্বেগ বিশ্বে আরও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঘটাতে পারে, যা বিপর্যয়কর ভুল হিসাব এবং পদক্ষেপের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।