• ঢাকা বুধবার
    ০৪ মার্চ, ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২
৭ কলেজ সংকট

ঢাকার তিন স্থানের সড়ক শিক্ষার্থীদের দখলে, তীব্র যানজট-ভোগান্তি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম

ঢাকার তিন স্থানের সড়ক শিক্ষার্থীদের দখলে, তীব্র যানজট-ভোগান্তি

সিটি নিউজ ডেস্ক

প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের লক্ষ্যে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারির এক দফা দাবিতে রাজধানীর তিন গুরুত্বপূর্ণ মোড় পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার, সায়েন্স ল্যাব ও গাবতলীর টেকনিক্যাল একযোগে অবরোধ করেছেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এসব এলাকার আশপাশের বিভিন্ন সড়কেও তারা অবস্থান নিয়েছেন।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল ১১টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ, যাত্রী ও রোগীরা।
ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় যানবাহন কার্যত ‘ব্লকেড’ অবস্থায় রয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ মূল সড়ক থেকে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
তাঁতিবাজার থেকে ছড়িয়ে পড়েছে যানজট
বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা তাঁতিবাজার মোড়ে সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে পুরো বংশাল সড়ক, গুলিস্তান ও জিরো পয়েন্ট এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

একই সঙ্গে শাহবাগ, সোনারগাঁও হোটেল মোড়, ফার্মগেট, মিরপুর ডিভিশন ও টেকনিক্যাল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়।
পুরান ঢাকার জনসন রোড হয়ে ইংলিশ রোডের তাঁতিবাজার মোড়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সড়কে শান্তিপূর্ণভাবে মানবদেয়াল তৈরি করে অবস্থান নিয়েছেন। তারা  ‘তাঁতিবাজার ব্লকেড’, ‘জেগেছে রে জেগেছে ছাত্ররা জেগেছে’, ‘দাবি মোদের একটাই- সেন্ট্রাল সেন্ট্রাল’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।

তারা শুধু অসুস্থ রোগীবাহী বাহন ও অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে দিচ্ছেন না।
ধোলাইখাল রোড, জনসন রোড, ইংলিশ রোড ও নয়া বাজার এলাকায় দীর্ঘ যানজট দেখা যাচ্ছে। 
কেরানীগঞ্জ থেকে আসা কামরুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, নয়া বাজার ব্রিজে ৩০ মিনিট বসে ছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে হেঁটে রওনা দিয়েছি। সরকার যদি দাবি যুক্তিসঙ্গত মনে করে, তাহলে স্পষ্ট করে বললেই তো হয়। সাধারণ মানুষ কেন ভোগান্তিতে পড়বে?

এই এলাকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেছেন, সাত কলেজের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন–২০২৫’র হালনাগাদ খসড়ার অনুমোদন এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারিই তাদের একমাত্র দাবি।

আগামীকাল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সম্ভাব্য সভায় এই খসড়া অনুমোদন দিয়ে দ্রুত অধ্যাদেশ জারি করা হলে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন। অন্যথায় আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। 


সায়েন্স ল্যাব মোড়
দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এ সময় তারা ‘রাষ্ট্র তোমার সময় শেষ, জারি করো অধ্যাদেশ’, ‘তালবাহানা বন্ধ করো, অধ্যাদেশ জারি করো’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। অবরোধের কারণে আশপাশের সড়কগুলোয় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ট্রাফিক ডিসি এম. তানভীর আহমেদ বলেন, শিক্ষার্থীরা তিনটি স্থানে কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি দুপুরের দিকে আরও কয়েকটি সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার মোড় অবরোধের মাধ্যমে প্রথম যানজটের সৃষ্টি হয়, যা বংশাল সড়ক হয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট ও সোনারগাঁও মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধের কারণে আশপাশের সড়ক, এলিফ্যান্ট রোড হয়ে শাহবাগ ও সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক জায়গায় যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুরো সড়ক কার্যত ব্লকেড হয়ে পড়েছে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষিত তিনটি স্থানের বাইরে নতুন করে বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেওয়ায় যানজটের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সোনারগাঁও হোটেলের সামনে মেট্রোরেলের নিচেও শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছেন। তবে ট্রাফিক পুলিশ বিকল্প সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ট্রাফিক উপকমিশনার আজাদ রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অবস্থান নেওয়া তাঁতিবাজার মোড়টি লালবাগ ডিভিশনের আওতাধীন। তবে ওই এলাকায় অবরোধের কারণে গুলিস্তানমুখী সড়কে যানজটের তীব্রতা বেশি দেখা দিয়েছে। সায়েদাবাদ এলাকায় সরাসরি যানজট না থাকলেও সেখানকার যানবাহন গুলিস্তান বা মতিঝিলের দিকে যেতে না পারায় সড়কে আটকে রয়েছে।

টেকনিক্যাল মোড় থেকে ছড়িয়ে পড়েছে অবরোধ
মিরপুরে অবস্থানরত বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট মিরাজ মাহবুব ইফতি জানান, দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গাবতলীর টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করেন। এতে টেকনিক্যাল মোড় থেকে তিন দিকে যানজট ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ‘সেন্ট্রাল সেন্ট্রাল’, ‘গোলামী না আজাদী’, ‘দালালি না রাজপথ’, ‘আপস না সংগ্রাম’, ‘শিক্ষা নাকি সিন্ডিকেট’সহ নানা স্লোগান দেন।

টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর ১০ নম্বর, গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল হয়ে আমিনবাজার এবং টেকনিক্যাল মোড় হয়ে আসাদগেট পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় অসংখ্য মানুষকে পায়ে হেঁটে গাবতলী আমতলা বাস টার্মিনালে যেতে দেখা যায়। এমনকি হাসপাতালের রোগীদেরও হেঁটে চলাচল করতে দেখা গেছে।

মিরপুর ডিভিশনের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মিরপুর টেকনিক্যাল মোড়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে ধীরে ধীরে পুরো মিরপুর ডিভিশনে যানজট ছড়িয়ে পড়ে। ট্রাফিক বিভাগ বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।

ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আজ সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত। অবরোধের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তবে পরীক্ষার্থীদের দ্রুত পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে।

ভোগান্তির অভিযোগ করে পথচারী মো. তুহিন বলেন, আমি শ্যামলী থেকে পায়ে হেঁটে এসেছি। ছাত্ররা রাস্তায় কেন থাকবে? কোনো রোগী মারা গেলে এর দায় কে নেবে?

আরেক পথচারী মো. হেলাল বলেন, কিছু হলেই ছাত্ররা রাস্তায় নামে। এভাবে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিলে ভবিষ্যতে কেউ এসব আন্দোলনে সমর্থন দেবে না।

ফার্মগেট-তেজগাঁও এলাকাতেও অবরোধ
এদিকে, সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে ফার্মগেট, খেজুর বাগান এলাকাতেও। তবে এই অবরোধ ভিন্ন কারণে বলছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেছেন, অনেক আগের একটি হত্যার ঘটনার বিচারের দাবিতে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা ফার্মগেট, খেজুর বাগান এলাকার এলিভেটের এক্সপ্রেস নিচে ও সড়ক অবরোধ করেছে। সেখানে ৭  কলেজের কেউ নেই বলে আমরা জানতে পেরেছি।

গতকাল মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ‘সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর আন্দোলন’র পক্ষ থেকে এই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বুধবার সকাল ১১টা থেকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব, টেকনিক্যাল ও তাঁতিবাজার মোড় অবরোধ করা হবে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, আগামী ১৫ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন–২০২৫’ অনুমোদন দিতে হবে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। সাত কলেজের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত আইনের খসড়া গত ২৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পরে বিভিন্ন পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়াটি হালনাগাদ করা হয়। সর্বশেষ গত ৭ ও ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবন অভিমুখে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছিল, ডিসেম্বরের মধ্যেই সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে জানুয়ারির শুরুতে অধ্যাদেশ জারি করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একটি সূত্রের মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন, আগামী ১৫ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। ওই সভাতেই চূড়ান্ত অনুমোদনের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ