প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার বার্তা পরিষ্কার যে—রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় পরিচয় নয়, আইনের শাসনই হবে চূড়ান্ত কথা। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার দাপট বা দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এই ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বড়। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল—সরকারি দলের নেতাকর্মীরা অনেক সময় আইনের বাইরে সুবিধা পেয়ে যান। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারে থাকা অবস্থায় নিজ দলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া একটি নতুন বার্তা দেয়।
প্রশাসনের প্রতি নির্দেশনা
প্রশাসনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—“সরকারি দল” বলে আলাদা কোনো সুবিধা নেই। কেউ অপরাধ করলে সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রেফতারের পর কেউ তদবির করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’
গত রোববার পুলিশের সদ্য বিদায়ি মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। সেখানে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, বেআইনি কর্মকাণ্ড ও মবসহ বিশৃঙ্খল বিভিন্ন তৎপরতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হবে না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা আইন মেনে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করবেন। ওই বৈঠকে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার যুক্ত ছিলেন। এ সময় অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়। ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের উপস্থিতিতে দেওয়া এই বার্তা মূলত প্রশাসনিক কাঠামোয় কঠোরতা নিশ্চিত করার ইঙ্গিত বহন করে।
দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে
ভাষণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা দেন। তার বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—এক, জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা। দুই, দলীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এ বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; এটি প্রশাসনিক ও দলীয় কাঠামোর প্রতি সরাসরি নির্দেশনাও বহন করে। “আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা”—এই ঘোষণা মূলত ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একটি কঠোর বার্তা, যেখানে বোঝানো হয়েছে যে দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারবে না।
দলীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কয়েকটি ঘটনায় নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্রেফতারের পর তদবির বা সুপারিশ করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘তদবির সংস্কৃতি’ একটি আলোচিত বাস্তবতা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এই নির্দেশ প্রশাসনের জন্য একটি বড় বার্তা, যা আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।যার প্রতিফলন ঘটেছে দেশের কয়েকটি জেলায়।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন
উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলমের বিরুদ্ধে বেড়িবাঁধের মেহগনি গাছ কেটে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে দলীয় পদ থেকে স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে সাংগঠনিক ও আইনগত—দুই ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে।
মাগুরা
ভিজিএফ চালের কার্ড বিতরণকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ও মামলা হয়। পুলিশ গ্রেফতারও করেছে।
এটি দেখায় যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা সুবিধা বণ্টন ঘিরে সহিংসতা হলে দল তা উপেক্ষা করছে না।
চাঁদপুর (মতলব উত্তর)
হাটবাজার ইজারার টেন্ডার নিয়ে সংঘর্ষে দলীয় কর্মীদের আটক করা হয়েছে।অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিরোধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ হয়েছে।
বরিশাল
আদালতে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান (লিংকন) আটক হন। যা বিচার বিভাগের প্রতি অশোভন আচরণ বা হস্তক্ষেপের ঘটনায় কঠোরতা প্রদর্শনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
রাজনৈতিক বার্তা ও প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি হচ্ছে গণমানুষের দল। জনগণ ভালোবেসে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে, আর জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার দায়িত্ব এখন বিএনপি সরকারের। সেই অঙ্গীকার নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজ শুরু করেছেন। তাই জনগণের সেবায় কেউ বাধা দিলে তা সহ্য করা হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাইফুল ইসলাম মনে করেন, সরকারে থেকেও নিজ দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইনের শাসনের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন—এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাপী প্রধানমন্ত্রীদের আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন পদক্ষেপ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব। ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের শীর্ষ নেতারা যদি স্বচ্ছতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেন, তবে তা শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে না, বরং জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী এ ধরনের উদাহরণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
১. চীন: লি জিনপিং
• পদক্ষেপ: ক্ষমতায় আসার পর “অ্যান্টি-করাপশন ক্যাম্পেইন” চালানো, দলের উচ্চপদস্থ নেতাদেরও আইনের আওতায় আনা।
• প্রভাব: রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শক্তিশালী, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সতর্কতা বৃদ্ধি।
• বাংলাদেশের তুলনা: কিশোরগঞ্জ, মাগুরা, চাঁদপুর ও বরিশালে বিএনপির নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলের পরিচয় অপরাধের ঢাল হিসেবে বিবেচিত হয়নি।
২. ভারত: নরেন্দ্র মোদি
• পদক্ষেপ: ২০১৬ সালে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল, কালোবাজারি ও জাল নোট দমন।
• প্রভাব: সরকারি ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি; অর্থনীতিতে প্রভাবিত চক্র নিয়ন্ত্রণ।
• বাংলাদেশের তুলনা: বাংলাদেশে চাঁদাবাজি, বেআইনি কর্মকাণ্ড ও ভিজিএফ বিতরণে অনিয়ম দমন করা হয়েছে।
৩. জার্মানি: অ্যাংলেলা মের্কেল
• পদক্ষেপ: সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত, দলের শীর্ষ নেতাদেরও আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
• প্রভাব: প্রশাসনে স্বচ্ছতা বজায়, সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি।
• বাংলাদেশের তুলনা: বিএনপি নিজ দলের নেতাদেরও আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা প্রদর্শন করছে।
৪. সিঙ্গাপুর: লেই কুইয়াং
• পদক্ষেপ: দুর্নীতি শূন্যে নামানো, প্রশাসনকে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা।
• প্রভাব: রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা।
• বাংলাদেশের তুলনা: পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বাধীন পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে একই নীতি প্রয়োগ হচ্ছে।
৫. কানাডা: জাস্টিন ট্রুডো
• পদক্ষেপ: সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন।
• প্রভাব: জনগণের আস্থা বৃদ্ধি।
• বাংলাদেশের তুলনা: প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে অপরাধ দমন করা হচ্ছে।
৬. তুরস্ক: আব্দুল্লাহ গুল
• পদক্ষেপ: দলের শীর্ষ নেতা ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ।
• প্রভাব: দুর্নীতি ও অনিয়ম কমানো।
• বাংলাদেশের তুলনা: বিএনপি দলের নেতাকর্মীদেরও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।
৭. চিলি: লুইস লাপাজ
• পদক্ষেপ: সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
• প্রভাব: প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি।
• বাংলাদেশের তুলনা: বিএনপি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।
তারেক রহমান ও বিএনপি যে নীতিকে বাস্তবে প্রয়োগ করছেন
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীরা আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমনকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি এই নীতিকে বাস্তবে প্রয়োগ করছেন। প্রশাসনকে স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নিতে দেওয়া এবং দলের নেতাকর্মীদেরও আইনের আওতায় আনা—এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জনগণের আস্থা সরকারের প্রতি আরও দৃঢ় হবে। আর তারেক রহমান হবেন সবচেয়ে সফল একজন রাষ্ট্রনায়ক।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ যা বলছে
বিশ্লেষন বলে , রাজনৈতিকভাবে এটি সরকারের জন্য ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের সুযোগ। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। আর প্রশাসনিকভাবে মাঠপর্যায়ে পুলিশকে স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ বাস্তবায়ন হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হতে পারে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে বার্তা গেছে—ক্ষমতার অপব্যবহার করলে দল রক্ষা করবে না। কেউ কেউ আবার মনে করেন, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সব পর্যায়ে সমান কঠোরতা বজায় রাখা কঠিন। তাদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ও দল উভয়ই এখন কঠোর অবস্থানে আছে। এখন দেখার বিষয়, এই “জিরো টলারেন্স” নীতি কতটা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং তা বাস্তবে জনগণের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার বিষয়।