প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটে বিজয়ী হলেও বিএনপি মনোনীত চার প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। তারা হলেন—চট্টগ্রাম-৪ আসনের আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর, শেরপুর-২ আসনের ফাহিম চৌধুরী ও কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া।
এরমধ্যে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সংশ্লিষ্ট আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তাদের বিষয়ে আদালত বলেছেন, তারা নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল স্থগিত থাকবে, ফল গেজেট আকারে প্রকাশ হবে না।
ফাহিম চৌধুরীর দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে জামায়াত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া ও মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্রে দলীয় প্রত্যয়নপত্র না থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী হাছান আহম্মেদের করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদালত বলেছেন, তারা ভোটে বিজয়ী হলে ফলের গেজেট প্রকাশ ও শপথগ্রহণে কোনো বাধা নেই। মামলায় জয়ী হলে তারা সংসদ সদস্য পদে থাকবেন। কিন্তু আপিলকারীরা মামলায় জয়ী হলে তাদের সংসদ সদস্য পদ থাকবে না।
আইনজীবীরা বলেছেন, এই চার প্রার্থী যদি ভোটে হেরে যান তবে মামলার আর কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব গণমাধ্যমকে বলেন, আদালত বলেছেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। এমন কোনো আদেশ দেবেন না, যার ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপিরা সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পায়। অনেকের মনোনয়ন বাতিলও করেছিলেন।
‘কিন্তু আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীরের মামলা যেহেতু শেষের দিকে তাই আদালত মনে করছেন নির্বাচন থেকে তাদের দূরে রাখাটা গণতন্ত্রের পক্ষে সঠিক হবে না। আমি বলব এক্ষেত্রেও আদালত ন্যায়বিচার করেছেন। যদি প্রমাণ হয় তারা ঋণখেলাপি নন, তবে বিজয়ী হলে সঙ্গে সঙ্গে ভোটের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করে দেবে নির্বাচন কমিশন। আর ভোটে হেরে গেলে মামলার কোনো প্রাসঙ্গিকতাই থাকবে না’—বলেন এ আইনজীবী।
সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এমকে রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আপিল বিভাগে এটি নতুন ও ব্যতিক্রমী আদেশ। এর আগে আমরা এমন আদেশ দেখিনি। যদিও আমরা মনে করি, ঋণখেলাপিদের নমিনেশনের বৈধতা না দিলে সব দল ও প্রার্থীসহ সবাই সতর্ক হতো। ওয়েস্ট বেঙ্গল (ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) এটি করেছে। এখানে পরে সুপ্রিম কোর্টে এসেছে। নির্বাচন কমিশন থেকেই এটি করা উচিত ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইফুল আলম ইজ্জল বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে স্ট্যান্ডটা নেওয়া দরকার ছিল রাজনৈতিক দলগুলার। কিন্তু জেনেশুনেও ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা অনেককে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনের আসলাম চৌধুরী
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী ও যমুনা ব্যাংক পৃথক লিভ টু আপিল করে।
আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন জানান, আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন। আদালত বলেছেন, আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল গেজেটে আকারে প্রকাশ হবে না।
চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর
চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থীর করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ দেন।
আদেশের পর সারোয়ার আলমগীরের আইনজীবী আহসানুল করিম জানিয়েছেন, নির্বাচনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন সারোয়ার আলমগীর। লিভ মঞ্জুর হওয়ায় আপিলের ওপর শুনানি হবে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলটি করেছিলেন চট্টগ্রাম-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। আপিল বিভাগের আদেশের পর তার আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছেন। আদালত বলেছেন, সারোয়ার আলমগীর নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফলটা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলাফল প্রকাশিত হবে না।
শেরপুর-২ আসনের ফাহিম চৌধুরী
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আর কোনো বাধা নেই। গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এক আদেশে তার প্রার্থিতা বহাল রাখেন।
এর আগে, ফাহিম চৌধুরীর নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে একই আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর করা একটি ‘লিভ টু আপিল’ শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দেন।
আদেশের পর ফাহিম চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আদালতের এ আদেশের ফলে ফাহিম চৌধুরীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আর কোনো বাধা নেই।
তবে আপিলকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু বলেন, বিএনপির প্রার্থী ফাহিম চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিলেও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ইস্যুতে করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আসনের নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত থাকবে।
কুমিল্লা-১০ আসনের মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া
কুমিল্লা-১০ আসনের ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া নির্বাচন করতে পারবেন। তার প্রার্থিতা নিয়ে করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে গত ১ ফেব্রুয়ারি আদেশ দেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।
আদালতে মোবাশ্বের আলমের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া জানান, মোবাশ্বের আলম নির্বাচন করতে পারবেন। তবে ভোটের ফল কী হবে, সেটি আপিল নিষ্পত্তির ওপর নির্ভর করবে।