• ঢাকা শনিবার
    ১১ জুলাই, ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

কমলাবতীর বার্তা: প্রকৃতি কি নতুন সতর্কবার্তা দিচ্ছে?

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম

কমলাবতীর বার্তা: প্রকৃতি কি নতুন সতর্কবার্তা দিচ্ছে?

কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপ (সংগৃহীত)

সৈয়দ আতিক

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বিরল কোরাল রেড কুকরি বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত কমলাবতী সাপের ধারাবাহিক উপস্থিতি নিছক একটি প্রাণীবৈচিত্র্যের সংবাদ নয়; এটি প্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। কয়েক বছর আগেও যে সাপটি ভারতের হিমালয়সংলগ্ন কয়েকটি অঞ্চল ও নেপালের সীমিত এলাকায় দেখা যেত, সেটি আজ বাংলাদেশের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে নিয়মিত মিলছে। এই পরিবর্তন শুধু একটি বিরল প্রাণীর বিস্তৃতির গল্প নয়; এটি প্রকৃতির পরিবর্তিত ভাষা, যা আমরা বুঝতে শুরু করেছি মাত্র।

কমলাবতীর বৈজ্ঞানিক নাম Oligodon kheriensis। এটি কুকরি (Kukri) গোত্রের একটি নির্বিষ (Non-venomous) সাপ। ১৯৩৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের লাখিমপুর খেরি জেলায় প্রথম এ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘ প্রায় আট দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এর দেখা মেলে খুবই সীমিত সংখ্যায়। পরবর্তীকালে ভারতের উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, আসামের কোকরাঝাড়, মেঘালয়ের পশ্চিম গারো পাহাড় এবং নেপালের চিতওয়ান, শুক্লাফাঁটা ও বারদিয়া জাতীয় উদ্যানে এর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চগড়ে প্রথমবারের মতো এই সাপ বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে কমলাবতীর নিশ্চিত আবাসস্থলের তালিকায় যুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বের যেসব দেশে এই প্রজাতির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক রেকর্ড রয়েছে, সেগুলো হলো ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ। ভুটান, চীন, মিয়ানমার কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য কোনো দেশে এখন পর্যন্ত এ সাপের নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক রেকর্ড প্রকাশিত হয়নি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০২১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অন্তত ৬৬টি কমলাবতী সাপ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি বিরল প্রজাতির ক্ষেত্রে এই সংখ্যা গবেষকদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এটি কি সত্যিই এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ইঙ্গিত, নাকি এতদিন আমাদের অজ্ঞতার কারণে এরা নথিভুক্ত হয়নি? উত্তরটি এখনও স্পষ্ট নয়। তবে উভয় সম্ভাবনাই বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সংগৃহীত

প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাপ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারী দল এবং গবেষকদের প্রচেষ্টার কারণে মানুষ অচেনা সাপ দেখলেই এখন অনেক ক্ষেত্রে হত্যা না করে উদ্ধারকারীদের খবর দিচ্ছেন। ফলে আগে যেসব সাপ নীরবে হারিয়ে যেত, এখন সেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, বন উজাড়, কৃষিজমির পরিবর্তন এবং নগরায়ণের কারণে বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক আবাস হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে হাজার হাজার প্রাণী নতুন অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে। জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সরীসৃপের বিস্তৃতি পরিবর্তনের ঘটনাও বাড়ছে। কমলাবতীর উত্তরবঙ্গে উপস্থিতি সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই অংশ হতে পারে।

পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলের সঙ্গে পরিবেশগত মিল থাকায় এই এলাকাগুলো কমলাবতীর জন্য অনুকূল আবাসস্থল হয়ে উঠেছে বলে গবেষকদের ধারণা। ভবিষ্যতে দিনাজপুর, নীলফামারী বা লালমনিরহাটের মতো উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলাতেও এ প্রজাতির উপস্থিতি ধরা পড়তে পারে।

সংগৃহীত

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ মানুষ সাপ মানেই বিষধর এবং শত্রু—এমন ধারণা পোষণ করেন। ফলে নির্বিষ ও বিরল প্রজাতির সাপও অজ্ঞতার কারণে মারা পড়ে। অথচ কমলাবতী মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। এটি লাজুক স্বভাবের এবং সাধারণত মাটির নিচে বা নরম মাটিতে বসবাস করে। খাদ্যশৃঙ্খলে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিরল প্রজাতির অকারণ মৃত্যু শুধু একটি প্রাণীর ক্ষতি নয়; বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি।

এখানে স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারী ও গবেষকদের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রচেষ্টাতেই আজ কমলাবতী নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসছে। কিন্তু কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।

বাংলাদেশে এখনও বন্যপ্রাণী গবেষণার বাজেট সীমিত, গবেষণাগার কম, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা দুর্বল এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের উচিত প্রাণীর স্থানান্তর, নতুন প্রজাতির আগমন এবং জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তনকে জাতীয় গবেষণা অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান দেওয়া।

সরকারের বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরীসৃপ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে বিরল ও নির্বিষ সাপ দেখলেই হত্যা না করে সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

প্রকৃতি কখনো হঠাৎ করে বদলায় না; সে ধীরে ধীরে সংকেত দেয়। কমলাবতীর আবির্ভাবও তেমনই একটি সংকেত। এটি হয়তো বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, আবার একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ আমরা যদি সেই বার্তা বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী দিনে আরও বহু বিরল প্রাণী হয়তো বিলুপ্তির পথে চলে যাবে।

কমলাবতীর লালচে-কমলা রং তাই শুধু একটি বিরল সাপের পরিচয় নয়; এটি প্রকৃতির পাঠানো একটি নীরব সতর্কবার্তা। সেই বার্তা অনুধাবন করে গবেষণা, সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মতামত সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ