• ঢাকা বুধবার
    ০৪ মার্চ, ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কৌশল বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল, দীর্ঘ সংঘাতের আশঙ্কা

প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কৌশল বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল, দীর্ঘ সংঘাতের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত তেহরানে শাসন পরিবর্তন ঘটানো। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধের চতুর্থ দিনে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার বদলে প্রতিরোধের অবস্থান নিয়েছে।

প্রাথমিক ধারণা ছিল, হামলার ফলে ইরানের ভেতরে ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরি হবে এবং সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষতি করেছে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেলআবিব এখন তাদের কৌশল নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান আলোচনার সম্ভাবনাকে দূরের বিষয় হিসাবে দেখছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতিও ইরান ঠান্ডা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আশ্রয় দিলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করছে।

ইরানের নতুন কৌশল

ইরানও তাদের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। ইসরাইলে বড় আকারের একযোগে হামলার বদলে ধারাবাহিক ছোট আকারের হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করার চেষ্টা করছে তারা। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধ মাসের পর মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তাদের ক্ষতির মূল্য বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি খরচ গুনতে হবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে চাপ

ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়টি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে তারা সহায়তা চেয়েছে। ইরান স্পষ্টভাবে শুধু ইসরাইল নয়, বরং পুরো মার্কিন নিরাপত্তা বলয়কে চাপের মুখে ফেলতে চাচ্ছে।    

জ্বালানি ও বাণিজ্যে প্রভাব

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে ইরান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও চাপ সৃষ্টি করেছে। এতে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। সৌদি আরব তাদের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বন্ধ করেছে এবং কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করাই ইরানের অন্যতম লক্ষ্য।

ইরানের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা

ইরানের ভেতরে বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন দেখা না যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প কৌশল হিসেবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির পথ বিবেচনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কুর্দি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথা আলোচনায় এসেছে। তবে ইরান এটিকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আগাম হামলার কথাও জানিয়েছে। ইরান ইরাকের এরবিলের কাছে কুর্দি সংগঠনগুলোর কয়েকটি শিবিরেও হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সামরিক সাফল্যের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির ভারসাম্যের ওপর। ইরান সময় বাড়িয়ে এবং বিভিন্ন খাতে চাপ সৃষ্টি করে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চাচ্ছে। উপসাগরীয় ঘাঁটিতে হামলা, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং বাণিজ্য ব্যাহত করা—সবই এই কৌশলের অংশ।  ইরান সংকট শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

আর্কাইভ