প্রকাশিত: আগস্ট ৬, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে আবারও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম এক লাফে ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা নির্ধারণ করেছে। নতুন এ দাম বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ৩১ জুলাইও স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সেদিন ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। ফলে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম বেড়েছে মোট ১২ হাজার ৭২ টাকা। এত অল্প সময়ে এমন বড় মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতা, বিনিয়োগকারী এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ী—সবার মধ্যেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কেন হঠাৎ এত বাড়ল স্বর্ণের দাম?
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এর পেছনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বর্ণকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বেছে নেন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুদ বাড়ানোর প্রবণতাও বাজারে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, ব্যাংকিং খরচ এবং স্থানীয় বাজারে কাঁচা স্বর্ণের সরবরাহ। এসব কারণ মিলেই দেশের বাজারে দামের চাপ আরও বেড়ে যায়।
সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?
নতুন মূল্য কার্যকরের ফলে বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে স্বর্ণ কিনতে আগ্রহীদের এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
শুধু স্বর্ণের মূল দামই নয়, এর সঙ্গে যোগ হয় ভ্যাট, অলংকার তৈরির মজুরি এবং অন্যান্য চার্জ। ফলে একটি গহনা কিনতে বাস্তবে ব্যয় আরও বেশি হবে।
অন্যদিকে, যাদের কাছে আগে থেকে স্বর্ণ রয়েছে, তারা বিক্রি করলে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দোকানভেদে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
স্বর্ণের দাম দ্রুত বাড়লে বাজারে সাধারণত অলংকারের বিক্রি কিছুটা কমে যায়। কারণ অনেক ক্রেতাই দাম কমার অপেক্ষায় কেনাকাটা স্থগিত রাখেন। এতে ছোট ও মাঝারি জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ উচ্চমূল্যেও স্বর্ণ কিনে থাকেন, কারণ দীর্ঘমেয়াদে এটি তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সামনে দাম আরও বাড়তে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম এবং ডলারের বিনিময় হার যদি উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে দেশের বাজারেও আরও মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমতে শুরু করলে স্থানীয় বাজারেও মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে স্বর্ণের বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই প্রতিদিনের আন্তর্জাতিক বাজার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতি, ডলারের গতিপ্রকৃতি এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছুই দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
নতুন দামে প্রতি ভরি স্বর্ণ
• ২২ ক্যারেট: ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা
• ২১ ক্যারেট: ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ টাকা
• ১৮ ক্যারেট: ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৬ টাকা
• সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা
অস্বাভাবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত
এক সপ্তাহে ভরিতে ১২ হাজার টাকার বেশি দাম বৃদ্ধি দেশের স্বর্ণবাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যারা বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ কিনতে চান, তাদের আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনের মতো না হলেও বিয়ে বা পারিবারিক প্রয়োজনের ক্রেতাদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।