প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং—‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন- ফাইল ছবি
ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং—‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ঢাকায় আগমনকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। তবে সফরের উদ্দেশ্য বা আলোচ্যসূচি নিয়ে বাংলাদেশ কিংবা ভারতের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ঢাকায় পৌঁছান। পরাগ জৈনের সঙ্গে রয়েছেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। ঢাকায় সফরকালে প্রতিনিধি দলটি একটি হোটেলে অবস্থান করবেন বলে জানা গেছে।
তবে এই সফরকে শুধু একটি গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের পুরোটা ধরা পড়বে না। বরং সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সফরটিকে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
সম্পর্কের বরফ গলানোর নতুন বার্তা?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে দুই দেশ সেটি কাটিয়ে উঠতে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশরি মে মাসে জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে স্থবির হয়ে থাকা বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কনস্যুলার বিষয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৪০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে দুই দেশের।
জুনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনও দুই দেশের সম্পর্ককে মর্যাদা, সমতা, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে সীমান্ত সমস্যাসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধানের কথাও বলা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর দুই দেশের সম্পর্কের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্তরে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের একটি ইঙ্গিত হতে পারে।
নিরাপত্তা ইস্যুই কি আলোচনার কেন্দ্রে?
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি নিরাপত্তা। দুই দেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে চোরাচালান, মাদক, মানবপাচার, জাল মুদ্রা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও অবৈধ চলাচল নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয়ও এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জুনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত ৫৭তম ডিজি পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনেও সীমান্তে সমন্বিত টহল, নজরদারি বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
তাই ‘র’ প্রধানের সফরে সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয় আলোচনায় আসতে পারে—যদিও এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি।
শেখ হাসিনা ইস্যু: সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার জায়গা এখনো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও ঢাকা অসন্তোষ জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, প্রত্যর্পণের অনুরোধ আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।এ অবস্থায় ভারতের গোয়েন্দা প্রধানের ঢাকা সফরে সরাসরি এই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এটি যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘হাই-সেনসিটিভ’ ইস্যু, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে হলে রাজনৈতিক আস্থার সংকটও কমাতে হবে—এটাই ঢাকা-দিল্লির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও নতুন করে গতি পেতে পারে। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পণ্য আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ—বহু খাতে দুই দেশের স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে সীমান্ত বাণিজ্য, স্থলবন্দর কার্যক্রম, পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য ভারতের বিশাল বাজার এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি বাস্তবভিত্তিক ক্ষেত্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের স্বার্থ রয়েছে।
সম্পর্কের উন্নতি হলে বিদ্যুৎ আমদানি, জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক গ্রিড সংযোগ এবং ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
পানি: সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে এর নবায়ন এখন ঢাকা-দিল্লির সামনে অন্যতম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি এই চুক্তি নিয়ে বাস্তবসম্মত সমঝোতা করা গেলে তা পারস্পরিক আস্থার বড় ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তা, গঙ্গা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের জন্যও সীমান্তবর্তী অঞ্চল, নদী ব্যবস্থাপনা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, নিরাপত্তার পাশাপাশি পানি কূটনীতি হবে ভবিষ্যৎ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম প্রধান সূচক।
ভিসা ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করেন।
ভারত ধীরে ধীরে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর আশ্বাস দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে ভিসা কার্যক্রম আরও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভিসা ব্যবস্থা সহজ হওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত স্বাভাবিক হওয়া এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানো সম্পর্কের দৃশ্যমান উন্নতির সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত প্রতিযোগিতাও প্রাসঙ্গিক
পরাগ জৈন ঢাকায় আসার আগে চীন সফর করেছেন—এমন তথ্যও এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যায় না।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঢাকার পররাষ্ট্রনীতি যেন কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা ও কৌশলগত ভারসাম্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ শুধু প্রতিবেশী হিসেবে নয়; উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার দিক থেকেও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
পরাগ জৈনের সফরকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এটি কি বিচ্ছিন্ন একটি নিরাপত্তা যোগাযোগ, নাকি বৃহত্তর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গোপন প্রস্তুতি?
বর্তমান পরিস্থিতির কয়েকটি দিক অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ—প্রথমত, দুই দেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় করছে।দ্বিতীয়ত, সীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতায় যোগাযোগ বাড়ছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রকাশ্য বার্তা এসেছে।চতুর্থত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও ভিসা—এসব বাস্তব খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।পঞ্চমত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানি বণ্টন ও বাণিজ্য ভারসাম্যের মতো কঠিন বিষয়গুলো এখনো রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে পরাগ জৈনের ঢাকা সফরকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ‘রিসেট’ প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে নতুন উচ্চতায় নিতে হলে শুধু গোয়েন্দা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক আস্থা, সীমান্তে শান্তি, পানি বণ্টন, বাণিজ্যে ভারসাম্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং জনগণের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে—নিরাপত্তার আড়ালের যোগাযোগ কতটা দৃশ্যমান রাজনৈতিক সমঝোতায় এবং রাজনৈতিক সমঝোতা কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক ও জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতায় রূপ নেয় তার ওপর।