• ঢাকা সোমবার
    ১০ আগস্ট, ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ, বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রায় ৩৭০০ মেগাওয়াট

প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ, বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রায় ৩৭০০ মেগাওয়াট

সিটি নিউজ ডেস্ক

গরমের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। গত রোববার বিকেলে দেশের কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। 

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।

এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ফলে রোববারের পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিকেল ৫টার দিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যায়।

গ্যাস সংকটে কমেছে উৎপাদন

পিডিবি জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কমপক্ষে ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রোববার বিকেল ৫টায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট। একইভাবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট।

কমেছে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ

বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায়। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে পিক আওয়ারে আদানি থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও রোববার বিকেল ৫টায় সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট।

আদানি কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় তাদের কয়লার মজুত কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে।

তবে আদানির দেওয়া তথ্য পিডিবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতে হওয়ায় সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শনের সুযোগও সীমিত।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন কম

আদানি ছাড়া দেশের বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে উৎপাদন কমেছে।

বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। 

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। পরে রাতে সেটি চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এই কেন্দ্র থেকে ওই সময়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৭১০ মেগাওয়াট।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকেও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে। কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট। 

এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট, যেখানে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।

উৎপাদন ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট

পিডিবির হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি হচ্ছে কমপক্ষে ২ হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে কয়লা সংকট ও বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে আরও অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে।

অর্থাৎ গ্যাস ও কয়লা সংকটসহ বিভিন্ন কারণে মোট প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্যতামূলকভাবে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

এলএনজি সরবরাহ বাড়ার আশা

এদিকে গ্যাস সংকট কিছুটা কমার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে।

মেরামত শেষে গত ৫ আগস্ট রাতে টার্মিনালটি থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।

রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই দুই টার্মিনাল থেকে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।

পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ শুরু হলে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

তবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা। ফলে তীব্র গরমের মধ্যে আগামী কয়েকদিনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিং অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ