প্রকাশিত: মার্চ ১৫, ২০২৬, ০১:২৬ এএম
সারা দেশে গ্লুকোমাজনিত সমস্যায় ভুগছেন ৮০ লাখ মানুষ। গ্লুকোমা হলো- চোখের এক নীরব ঘাতক রোগ। যা চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগকারী অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি করে। গ্লুকোমায় আক্রান্ত হলে অপটিক স্নায়ু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দৃষ্টিশক্তি কমতে শুরু করে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। বর্তমানে দেশে গ্লুকোমা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ লাখ এবং সন্দেহভাজন রোগী ৬০ লাখ। সবমিলে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ চোখের গ্লুকোমাজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ- ২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীর ধামনন্ডিতে বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে সোসাইটির মহাসচিব ডা. শাহনাজ বেগম গ্লুকোমা রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু নিরাময় করা সম্ভব নয়। ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ রোগীর মত সুনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং নিয়মিত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ২০২৪ সালের দেশব্যাপী এক জরিপে দেখা গেছে যে ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সি বাংলাদেশীদের মধ্যে গ্লুকোমার প্রবণতা ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যার মধ্যে আনুমানিক ২০ লাখ আক্রান্ত এবং ৬০ লাখ সন্দেহভাজন রোগী। প্রাথমিক ওপেন-এঙ্গেল গ্লুকোমা সবচেয়ে সাধারণ ধরণ (৭৮ শতাংশ) যার প্রকোপ বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে বেশি। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ শতাংশই রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা নয়, যার ফলে রোগ নির্ণয় বিলম্বিত হয়।
তিনি আরও বলেন, গ্লুকোমা বিশ্বে স্থায়ী অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বের ৮ কোটি মানুষ গ্লকোমায় আক্রান্ত যার মধ্যে সারে ৪৫ লাখ গ্লুকোমার কারনে অন্ধ। বিশ্বে ৯০ ভাগ মানুষ এ রোগ সম্পর্কে জানেনা, যার মধ্যে বেশিরভাগ স্বল্পন্নোত দেশগুলোতে। ২০৪০ সাল নাগাদ প্রায় ১২ কোটি মানুষ গ্লুকোমায় আক্রান্ত হবে। অনুষ্ঠানে জানানো হয় প্রতিবছর ৮ থেকে ১৪ মার্চ বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ পালন করা হয়। এবারও বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি সারা দেশে সপ্তাহব্যাপী গ্লুকোমা সচেতনতামূলক লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানার বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল সকালে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জিননুরাইন (নিউটন) ধানমন্ডির হারুন আই ফাউন্ডেশন হাসপাতালে সোসাইটির কার্যালয়ের সন্দেহভাজন রোগীদের বিনামূল্যে গ্লুকোমা স্ক্রিনিং ক্যাম্প উদ্বোধন করেন। এরপর চিকিৎসক রোগীদের নিয়ে সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে জনসাধারণের মধ্যে গ্লুকোমা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে আলোচনা সভা ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম। তিনি গ্লুকোমা রোগের গনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান এবং গ্লুকোমা রোগ প্রতিরোধে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা কামনা করেন।
প্রধান অতিথি বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শাহাবউদ্দিন এবং মহাসচিব ডা. মো. জিননুরাইন (নিউটন) গ্লুকোমা রোগের ভয়াবহতা ও চিকিৎসা সম্পর্কে বক্তব্য দেন। অন্যান্যদের মধ্যে বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক এম নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান, অধ্যাপক মো. আরিফ মিয়া, ডা. এম জিয়াউল করিম, অধ্যাপক ডা. হাসান শহীদ ও অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা সহীদ, বারডেম হাসপাতালের দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. অরুপ রতন চৌধুরী ও শাহজাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম শাহি আলম গ্লুকোমা রোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বক্তারা জানান, বাংলাদেশে অন্ধত্বের কারণ হিসেবে ছানি প্রথম এবং গ্লুকোমা দ্বিতীয় কারণ। কিন্তু গ্লুকোমা আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি মানুষই জানেন না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি, পরিবারের কারো গ্লুকোমা থাকলে, ডায়াবেটিস রোগী, এবং অতিরিক্ত মাইনাস পাওয়ারের চশমা ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি বেশি। শুরুতে কোনো লক্ষণ থাকে না, তবে অগ্রসর হলে পার্শ্ববর্তী দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখের ব্যথা, লাল হওয়া বা আলোর চারপাশে রংধনু বলয় দেখা যেতে পারে। চোখের চাপ পরীক্ষা, অপটিক স্নায়ু পরীক্ষা, এবং ফিল্ড টেস্টের মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা হয়। চোখে ড্রপ, লেজার বা সার্জারির মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়।