• ঢাকা মঙ্গলবার
    ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
নেপালের আসন্ন নির্বাচন

বিলাসবহুল জীবন প্রদর্শন করে সমালোচিত নেতাদের সন্তানরা

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২৬, ০৯:১৭ এএম

বিলাসবহুল জীবন প্রদর্শন করে সমালোচিত নেতাদের সন্তানরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রভাবশালী নেতাদের সন্তানদের দামি ব্র্যান্ডের পোশাক, ঘড়ি, বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল ভ্রমণ এবং রাজকীয় বিয়ের ছবিগুলো নেপালের সাধারণ তরুণদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। নেপালের মতো একটি দেশে, যেখানে যুব বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি এবং লাখ লাখ তরুণ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, সেখানে আকাশচুম্বী বৈষম্য মেনে নেয়া অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়েছে

নেপালের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন। ‘নেপো কিডস’ হিসেবে পরিচিত এ প্রভাবশালীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শিত অঢেল সম্পদ ও বিলাসিতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ জনরোষ নেপালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে এতটাই প্রভাবিত করছে যে, প্রথাগত দলগুলো এখন দুর্নীতি ও বংশপরম্পরায় চলে আসা রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা স্বজনপ্রীতি মোকাবিলায় কঠোর প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হচ্ছে। খবর বিবিসি।

এ অসন্তোষের মূলে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রভাবশালী নেতাদের সন্তানদের দামি ব্র্যান্ডের পোশাক, ঘড়ি, বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল ভ্রমণ এবং রাজকীয় বিয়ের ছবিগুলো নেপালের সাধারণ তরুণদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। নেপালের মতো একটি দেশে, যেখানে যুব বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি এবং লাখ লাখ তরুণ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, সেখানে আকাশচুম্বী বৈষম্য মেনে নেয়া অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ২৫ বছর বয়সী তরুণ সতীশ কুমার যাদব বলেন, ‘নেতাদের ছেলেমেয়েরা থাইল্যান্ড বা সুইজারল্যান্ডে আনন্দ করে, আর আমাদের মতো সাধারণ ঘরের সন্তানদের কাজের জন্য মরুভূমির দেশে যেতে হয়।’

গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই জমানো ক্ষোভ এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। নেপাল সরকার যখন সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধ করার প্রস্তাব দেয়, যেখানে তরুণরা প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, তখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় এবং তীব্র চাপের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আগামী সপ্তাহের নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি হলো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা।

জনরোষের মুখে অনেক ‘নেপো কিডস’ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আড়ালে চলে গেছেন। সাবেক এক মন্ত্রীর মেয়ে এবং সাবেক মিস নেপাল শ্রিঙ্খলা খাতিওয়াদা তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছেন। একইভাবে সাবেক মাওবাদী নেতা ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহালের নাতনি স্মিতা দাহাল তার দামি হ্যান্ডব্যাগ সংগ্রহের ছবি নিয়ে সমালোচনার মুখে নিজের অ্যাকাউন্টটি প্রাইভেট করে ফেলেছেন। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার ছেলের বিলাসবহুল বিয়ের ছবি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি এখন আর চোখে পড়ছে না।

তবে এর কিছু ব্যতিক্রমও আছে। গণ্ডকী প্রদেশের মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী বিন্দু কুমার থাপার ছেলে সৌগাত থাপা এখনো তার জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের ছবি শেয়ার করছেন। যদিও তার দাবি, তার এই সম্পদ বৈধ, কিন্তু সাধারণ মানুষ একে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্নীতিরই অংশ হিসেবে দেখছে। নেপালের মতো একটি দেশ, যেখানে এক-পঞ্চমাংশ মানুষ দিনে ২ ডলারের কম আয়ে জীবন চালায়, সেখানে এই প্রাচুর্য প্রদর্শন এক বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নেপালে দুর্নীতি কেবল অনুমানের বিষয় নয়, এটি একটি প্রমাণিত সংকট। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ৮৪ শতাংশ নেপালি মনে করেন সরকারি দুর্নীতি দেশের একটি বড় সমস্যা। সম্প্রতি একটি বিমানবন্দর নির্মাণে ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের দুর্নীতির অভিযোগে ৫ সাবেক মন্ত্রীসহ ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ভুটানি শরণার্থী সাজিয়ে নেপালিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর জালিয়াতিতেও জড়িয়েছে সাবেক মন্ত্রীদের নাম।

এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এখন তরুণ ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছে। মাত্র কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে প্রবীণ দলগুলোও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। নেপালি কংগ্রেস তাদের পাঁচবারের সভাপতি শের বাহাদুর দেউবাকে পরিবর্তন করেছে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের তদন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে তরুণ ভোটাররা এখনো সন্দিহান। তাদের মতে, শুধু দলীয় সংস্কার বা মেয়াদের সীমা নির্ধারণ করলেই দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা দুর্নীতি দূর হবে না। আগামী নির্বাচনকে তারা এক বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। সেপ্টেম্বর আন্দোলনের স্মৃতি বুকে নিয়ে সাধারণ ভোটাররা এখন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভের জবাব দিতে চান। নেপালের ভবিষ্যৎ এই নির্বাচনের ওপর অনেকখানি নির্ভর করছে—পুরানো নেতৃত্ব টিকে থাকবে নাকি নতুন কোনো ধারার সূচনা হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ