প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১০:১৮ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ২ ডলারের নিচে নামানো, গৃহঋণের সুদের হার ২ শতাংশে আনা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ অর্ধেক করার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবরের চিত্র বলছে, নিত্যপণ্য, জ্বালানি, বাড়ি কেনা, বিমানভাড়া ও স্বাস্থ্যবিমার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বেড়েছে। ফলে অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বেশ কিছু ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান রয়েছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ ব্যবধান ভোটারদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক এবং বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম, তবু সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন মার্কিন নাগরিক বলেছেন, অর্থনীতি সম্পর্কে তাদের ধারণা নির্ধারণে পণ্যের দাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনাভাইরাস মহামারির পর পাঁচ বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতির প্রভাব এখনো কাটেনি। এর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতিও মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়িয়েছে। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপের কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। এসব শুল্ক না থাকলে পণ্যের দাম কমতে পারত বলেও গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এতে তেল, পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগ ডাকোর মতে, ইরানে হস্তক্ষেপ এবং আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সরবরাহসংক্রান্ত চাপ তৈরির অন্যতম কারণ।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে, যা আগস্টে ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ হার অনেক বেশি।
তবে হোয়াইট হাউসের দাবি, ট্রাম্পের নীতি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের মূল্যস্ফীতির সংকট থামিয়েছে এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে। প্রশাসনের মুখপাত্র টেলর রজার্সের ভাষ্য, ট্রাম্প কর্মজীবী মানুষের জন্য বড় ধরনের করছাড় দিয়েছেন, ব্যবস্থাপত্রের ওষুধের দাম কমিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ১০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং প্রায় ২০টি বাণিজ্য চুক্তি করেছেন। আগামী দুই বছরেও এসব নীতির সুফল পাওয়া যাবে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বাড়িতে রান্নার জন্য কেনা খাবারের দাম বেড়েছে ৪ শতাংশ। এর আগের চার বছরে এ ধরনের খাবারের দাম বেড়েছিল ২৩ শতাংশ। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপের কারণে খাবারের দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
পেট্রল ও ডিজেলে বড় ধাক্কা
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৭ ডলার। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি, এ দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে পেট্রলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। অক্টোবর মাসের হিসাবে পেট্রলের এ দাম রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন।
ডিজেলের দামও বেড়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা প্রায় ৬ দশমিক ২৮ ডলার। পণ্য পরিবহন, কৃষি ও নির্মাণকাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এর দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয়ে পড়ছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিলেও স্বস্তি নেই
২০২৬ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলো বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পরিষেবার জন্য মাসে গড়ে ২৮০ ডলার ব্যয় করছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আবাসিক বিদ্যুতের গড় মাসিক ব্যয় বেড়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
পুরোনো বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা সংস্কার, বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং তথ্য সংরক্ষণকেন্দ্রের সম্প্রসারণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আবাসিক প্রাকৃতিক গ্যাসের গড় মাসিক দাম বেড়েছে ১০৬ শতাংশ।
শীত মৌসুমে ঘর গরম রাখার খরচ আরও বাড়তে পারে। জাতীয় জ্বালানি সহায়তা পরিচালকদের সংগঠনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ২০২৭ সালের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘর গরম রাখতে মার্কিন পরিবারগুলো গড়ে ১ হাজার ৩০ ডলার ব্যয় করতে পারে। জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ ব্যয় তিন মাসে গড়ে ২ হাজার ৬২৭ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
গাড়ির বিমায় কিছুটা স্বস্তি
ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিছুটা কমেছে গাড়ির বিমার খরচ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকে গাড়ির বিমার খরচ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মহামারির পর বিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহকদের আপত্তি এবং বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে এ পতন ঘটেছে। কনফারেন্স বোর্ডের অর্থনীতিবিদ ইয়েলেনা শুলিয়াতিয়েভার মতে, এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতির চেয়ে গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া ও বাজারের প্রতিযোগিতাই বেশি ভূমিকা রেখেছে।
বাড়ি কেনা এখনো ব্যয়বহুল
গৃহঋণের সুদের হার ২ শতাংশে নামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ফ্রেডি ম্যাকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০ বছর মেয়াদি নির্দিষ্ট সুদের গৃহঋণের গড় হার ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময় এ হার ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ।
বাড়ির দামও বেড়েছে। জিলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির গড় তালিকামূল্য ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার ৩৩৩ ডলার, যা ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি।
আটলান্টার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ি কেনার সামর্থ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় বার্ষিক আয় ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৭ ডলার। অথচ দেশটির মধ্যম বার্ষিক আয় ৮৬ হাজার ৪৯০ ডলার। প্রয়োজনীয় আয় ও প্রকৃত আয়ের এ ব্যবধান ২০০৫ সালের পর সবচেয়ে বেশি।
ক্রেডিট কার্ডের সুদ ২০ শতাংশের ওপরে
ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ১০ শতাংশে সীমিত করার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ডে গড় সুদের হার ২০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময় এ হার ছিল ২১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
প্রস্তাবটি নিয়ে দুই দলের আইনপ্রণেতাদের সমর্থন থাকলেও তা কার্যকর করার উদ্যোগ থেমে গেছে। আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার ১০ শতাংশে বেঁধে দিলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার আগ্রহ কমতে পারে। এতে কিছু গ্রাহকের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিমানভাড়া বেড়েছে ১৭ শতাংশ
২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বিমানভাড়া বর্তমানে ১৭ শতাংশ বেশি। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম বেড়েছে। জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, বর্তমানে প্রতি গ্যালন উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম ৪ দশমিক ৩৪ ডলার, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির গড় দামের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি।
এছাড়া স্বল্পমূল্যে বিমানসেবা দেওয়া স্পিরিট এয়ারলাইনস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটিও বিমানভাড়া বাড়ার অন্যতম কারণ।
স্বাস্থ্যবিমার খরচ বেড়েছে ৫৮ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রের সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবিমা আইনের আওতায় থাকা গ্রাহকদের গড় মাসিক বিমার কিস্তি ২০২৫ সালের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেড়ে ১৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড় ব্যয় ২ হাজার ১৩৬ ডলার।
স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বিমার আওতায় চিকিৎসা নেওয়ার আগে গ্রাহককে নিজের পকেট থেকে যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়, সেই গড় পরিমাণও বেড়েছে। গত বছরের শেষে বিমার খরচ কমাতে দেওয়া কর-সহায়তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াকে এর একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে গ্রাহকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ৩০টি অঙ্গরাজ্যের প্রায় ১০ লাখ স্বাস্থ্যবিমা গ্রাহকের কাছে ৫০০ ডলারের চেক পাঠানো শুরু করেছে।
ওষুধের দাম কমেছে
অন্যদিকে, ব্যবস্থাপত্রের ওষুধের দামে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকে ওষুধের দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এ সাফল্যের কৃতিত্ব নিজেদের নীতিকে দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং কম দামের বিকল্প ওষুধের সরবরাহ বাড়ার মতো বিষয়ও এতে ভূমিকা রেখেছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে কিছু ইতিবাচক চিত্র থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব পরিস্থিতির ব্যবধান আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।