• ঢাকা শনিবার
    ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
আজ বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক

ঢাকা আন্তর্জাতিক আইন মানতে চায়, কিন্তু দিল্লির সাড়া নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ১১:১২ এএম

ঢাকা আন্তর্জাতিক আইন মানতে চায়, কিন্তু দিল্লির সাড়া নিয়ে প্রশ্ন

সিটি নিউজ ডেস্ক

অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের নিয়মিত ফেরত আনছে বাংলাদেশ।ভারত থেকেও বাংলাদেশিদের ফেরত এনেছিল ঢাকা। সম্প্রতি বাংলাভাষী বিপুলসংখ্যক লোককে বাংলাদেশি দাবি করে ঠেলে দিতে (পুশইন) চাচ্ছে দেশটি। এতে সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে কয়েকশ মানুষ। এ ক্ষেত্রে দেশটি সীমান্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন ও বিধিবিধান মানছে না।

বাংলাদেশ এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও আইনি পথ অনুসরণ করতে এবং সংশ্লিষ্টদের মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করতে ভারতকে অনুরোধ করেছে। এ অবস্থায় নয়াদিল্লিতে আজ সোমবার বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে বৈঠক বসছে। সেখানেও পুশইন অন্যতম আলোচ্য বিষয়।  

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশিদের আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত আনছে বাংলাদেশ। অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় ফেরত আনা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় আন্তর্জাতিক আইন ও স্বীকৃত পদ্ধতি মেনে।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশইন নিয়ে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। যদিও দুই দেশের এ ধরনের বিষয় নিষ্পত্তি করার জন্য ২০১৭ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় কনস্যুলার সংলাপ চলে আসছে। যার মাধ্যমে দুই দেশের নাগরিক, ভিসা ও বন্দিবিনিময়-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ মে বাংলাদেশ-ভারত কনস্যুলার সংলাপটি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়। তবে জুলাই অভুত্থ্যানের পর দিল্লি অবৈধভাবে বাংলাভাষী মানুষদের সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠাতে শুরু করে। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য ২০২৫ সালে ভারতকে বৈঠকে বসতে আমন্ত্রণ জানায় ঢাকা। তাতে সাড়া মেলেনি। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে অনেক দিন আগেই ভারতকে দ্বিপক্ষীয় কনস্যুলার বৈঠকে বসতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লির কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের নীতি পরিষ্কার। কোথাও বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে গেলে তাদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ও আইন মেনে ফেরত আনা হবে। ভারতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ তাই করতে চায়।

তালিকা বিনিময়: সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশকে ২৮০০ ব্যক্তির তালিকা দিয়েছে। এর মধ্যে নামের পুনরাবৃত্তি রয়েছে ২৫০ জনের। আর অসম্পূর্ণ তথ্য রয়েছে প্রায় ৪০০ জনের। ৬০০ জনের নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে।

ভারতের একটি সূত্রের দাবি, অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশকে নামের তালিকা দেওয়া হচ্ছে। অতীতে এ বিষয়ে তাগিদ দিলেও অযাচিতভাবে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করেছে ঢাকা। এতে দীর্ঘ সময় ধরে আটক করা মানুষদের দেখভাল করতে হয়েছে, যার সঙ্গে বড় অঙ্কের ব্যয় জড়িত। ফলে এখন কোনো বাংলাদেশি পেলে তাদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর এ বাহিনী তাদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে।

নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ে বিলম্ব নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ভারতীয়রা যে তালিকা পাঠিয়েছে তাতে দেখা গেছে, একজনের নাম দুই থেকে তিনবারও রয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় থাকা সাড়ে ৪০০ জনের শুধু নাম দেওয়া হয়েছে। এখন এ নাম দিয়ে কীভাবে নাগরিকত্ব যাচাই করা সম্ভব! এর জন্য ব্যক্তির গ্রাম থেকে শুরু করে অন্যান্য তথ্য প্রয়োজন। সেগুলো ভারত থেকে দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ ভারত যে তালিকা পাঠিয়েছে, তারা বাংলাদেশি কিনা তার যাচাই-বাছাই চলছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কনস্যুলার সেবা। কারণ ভারত তাদের বিভিন্ন রাজ্যে আটক অবস্থায় থাকা যাদের বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিচ্ছে, রাজ্য সরকার তাদের কনস্যুলার সেবা দিচ্ছে না। ফলে ভারত যে দাবি করছে– বাংলাদেশিদের ফেরত নিচ্ছে না ঢাকা; বিষয়টি তা নয়। কনস্যুলার অ্যাকসেস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরেরও একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। এমনকি ভিয়েনা কনভেনশনে কনস্যুলার সেবার আইনে এর উল্লেখ রয়েছে। দিল্লি কেন আটকে থাকা ব্যক্তিদের কনস্যুলার সেবা দিতে চাচ্ছে না– বিষয়টি বোধগম্য নয়।

বাংলাদেশের প্রতিবাদ: পুশইনের ঘটনায় গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনে প্রতিবাদপত্র দিয়েছে। তাতে পুশইন বন্ধ করে আইনি পদ্ধতির মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ না নেওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া, কনস্যুলার নোটিশ পাওয়ার অধিকার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যথেচ্ছভাবে মানুষদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার বারবার চেষ্টা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি পারস্পরিক আস্থা ও সীমান্ত এলাকার স্থিতিশীলতা নষ্টের ঝুঁকি তৈরি করে। বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে এ ধরনের ঘটনা দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে অর্থপূর্ণ সংলাপের জন্য প্রয়োজনীয় গঠনমূলক বোঝাপড়ার পরিবেশকে নষ্ট করে।

বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলতে চায়, সব প্রত্যাবাসন অবশ্যই আইনসম্মত উপায়ে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম-পদ্ধতি ও প্রটোকল মেনে এবং সম্মত দ্বিপক্ষীয় পদ্ধতি অনুসারে সম্পন্ন করতে হবে।

ঢাকা অবিলম্বে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার সব রকম কার্যকলাপ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, এমন কোনো জনমতকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়, যা সংঘাত ও জনবিদ্বেষকে উস্কে দিয়ে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই আবারও প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও আইনি পথ অনুসরণ করতে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করতে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ।

উদ্বেগ, নিন্দা; এর আগে আসাম সীমান্ত দিয়ে প্রায় ১০০ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল ভারত। আবার আন্দামান সাগরেও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ঠেলে দিয়েছিল ভারতের নৌবাহিনী। এমন কর্মকাণ্ডকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত, অগ্রহণযোগ্য কাজ’ অভিহিত করে ভারত সরকারকে অমানবিক ও প্রাণঘাতী আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। এছাড়া হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সীমান্তের বাইরে মানুষদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার নিন্দা জানিয়েছে।

আর্কাইভ