প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
মাত্র ৪ মাস ৮ দিনের শিশু আলফান। জীবনের শুরুতেই তাকে লড়তে হয়েছে একের পর এক জটিলতা ও সংকটের সঙ্গে। বড় অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর নিউমোনিয়া, শ্বাসযন্ত্রের অকার্যকারিতা, শক, রক্তে সংক্রমণসহ একাধিক জটিলতায় সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে তার অবস্থা। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যা, সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবারের অদম্য অপেক্ষার পর ২৪ দিনের দীর্ঘ লড়াই শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে শিশুটি।
আলফানের থাইরয়েড ব্লাস্টোমা শনাক্ত হওয়ার পর অস্ত্রোপচারের আগে করা সূচিকোষ পরীক্ষা বা এফএনএসি-তে ক্যানসারজাতীয় রোগের আশঙ্কা দেখা দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় চিকিৎসকরা তার সম্পূর্ণ থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণের অস্ত্রোপচার করেন।

তবে অস্ত্রোপচারের মাত্র দ্বিতীয় দিনেই আলফানের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। গুরুতর খাবার বা তরল শ্বাসনালিতে চলে যাওয়াজনিত নিউমোনিয়া, শ্বাসযন্ত্রের অকার্যকারিতা এবং শক হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। দ্রুত তাকে জীবন রক্ষাকারী পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া, শ্বাসনালিতে নল স্থাপন এবং কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সহায়তায় নেওয়া হয়।
এরপর শিশুটির চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে ওঠে। শরীরে প্যারাথাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি, রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া এবং রক্তে গুরুতর সংক্রমণ দেখা দেয়। তীব্র নিউমোনিয়ার কারণে দীর্ঘ সময় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা প্রয়োজন হয়। দুই দফায় শ্বাসনালির নল খুলে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রথম দুইবারই তা সফল হয়নি।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক জীবাণুর সংক্রমণও শনাক্ত হয়। রক্তের নমুনায় ক্যান্ডিডা, শ্বাসনালির নল থেকে সংগৃহীত নমুনায় সিউডোমোনাস এবং কেন্দ্রীয় শিরার নলের অগ্রভাগের নমুনায় ক্লেবসিয়েলা জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
শিশুটির শারীরিক অবস্থা এবং জীবাণুর ওষুধ-সংবেদনশীলতার পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের চিকিৎসা সমন্বয় করা হয়।

পরিচালকের সার্বিক নির্দেশনা
আলফানের চিকিৎসার এই সংকটাপন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম। তিনি শিশুটির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও বিভাগগুলোকে প্রয়োজনীয় সার্বিক নির্দেশনা প্রদান করেন।
তার সার্বিক নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে হাসপাতালের সার্জিক্যাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, এন্ডোক্রাইনোলজি, পালমোনোলজি এবং নাক-কান-গলা বিভাগ সমন্বিতভাবে শিশুটির চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
আলফানের মতো সংকটাপন্ন একটি শিশুর চিকিৎসায় একাধিক বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত সিদ্ধান্ত, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২৪ দিনের নিবিড় চিকিৎসায় ফিরল প্রাণ
দীর্ঘ ২৪ দিনের নিবিড় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর ধীরে ধীরে আলফানের নিউমোনিয়া, রক্তের সংক্রমণ এবং রক্তে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আসে। একপর্যায়ে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হতে শুরু করে।
চিকিৎসার শেষ পর্যায়ে এসে প্রায় দুই সপ্তাহ কোনো অক্সিজেন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা ছাড়াই স্থিতিশীল থাকে শিশুটি। এরপর চিকিৎসকরা তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরার অনুমতি দেন।
তবে গিলতে সমস্যা পুরোপুরি দূর না হওয়ায় নাক দিয়ে পাকস্থলীতে খাবার পৌঁছানোর নল বা এনজি টিউব রেখেই তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পাশাপাশি এন্ডোক্রাইনোলজি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগে নিয়মিত ফলোআপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আলফানের এই ফিরে আসা কেবল একটি শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প নয়; এটি সংকটাপন্ন শিশুর চিকিৎসায় একটি দক্ষ ও সমন্বিত চিকিৎসক দলের ধৈর্য, অভিজ্ঞতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং নিরলস প্রচেষ্টারও প্রতিফলন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সার্জিক্যাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত এবং একমাত্র স্বতন্ত্র শিশু সার্জিক্যাল আইসিইউ হিসেবে সংকটাপন্ন শিশুদের নিবিড় চিকিৎসা ও জীবনরক্ষাকারী সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
আলফানের ২৪ দিনের এই দীর্ঘ চিকিৎসাযাত্রার সফল সমাপ্তি সেই ইউনিটের জন্যও নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের গল্প।
একটি শিশুর জীবন রক্ষার এই কঠিন যাত্রায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আলফানের ফিরে আসা যেন আবারও প্রমাণ করল—সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা, দক্ষ নেতৃত্ব, সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং নিরলস প্রচেষ্টা একসঙ্গে থাকলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও আশার আলো জ্বালানো সম্ভব।