প্রকাশিত: অক্টোবর ২, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কি পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে? অবস্থাদৃষ্টে তা-ই মনে হচ্ছে। গত মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী মনসুর বিন জায়েদ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সালমানের সঙ্গে থাকা উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলে ছিলেন সৌদির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান; সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির মহাসচিব আলী আল শামসি; ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আলী আল নেয়াদি ও অন্যরা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান জাতীয় দৈনিক ‘দ্য ন্যাশনাল’ বৈঠকটি সম্পর্কে লিখেছে, ‘এই সফর রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের প্রতিফলন। দেশ দুটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছে। উপসাগরীয় কূটনীতির আওতায় দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সফর বিনিময় একটি নিয়মিত বিষয়। যৌথ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের অবস্থান সমন্বয়ের লক্ষ্যে উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায়ই যাতায়াত করে থাকেন।’
দৃশ্যত মনে হচ্ছিল তারা যেন চিরকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অথচ বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমতের কারণে তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, বিশেষ করে ইয়েমেন ইস্যুতে। কারণ ইয়েমেন সংকট ছিল সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ।
ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আবদুর রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ইয়েমেনের সহযোগী ছিল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দুই শক্তিধর দেশ ইয়েমেনে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিতে শুরু করে। সৌদিরা ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় আর আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি)’ সহায়তা করে। আমিরাতের কাছে যখন হোদেইদাহ বন্দরসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চল নিরাপদ মনে হওয়া শুরু করল, তখন তারা যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। অথচ সৌদি আরব হুথিদের হাত থেকে পুরো ইয়েমেনকে মুক্ত করতে চেয়েছিল।
আরও বেশি কিছু বিষয়ে বিশেষ করে সুদান ও ইরান ইস্যু এবং অর্থনৈতিক ইস্যুতে তাদের মতপার্থক্য ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। এ কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন ‘অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক)’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল আমিরাত। দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আব্রাহাম অ্যাকর্ডের আওতায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রথম দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। যদিও সৌদি আরব এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। তবে বর্তমানে হুথির হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে ইসরাইলের পরিবর্তে পাকিস্তান ও পুরোনো শত্রু তুরস্কের দিকে ঝুঁকেছে রিয়াদ।
সেই পরিস্থিতি কি বদলে যাচ্ছে
মজার ব্যাপার হলো, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের ঠিক পর দিনই সৌদি সফরে যান আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর বিন জায়েদ। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা। তবে ইসরাইলি গণমাধ্যমের দাবি, বৈঠকে সৌদি আরবসহ অন্য আরব রাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইরান ও হুথির মতো ‘যৌথ হুমকি’র বিরুদ্ধে একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অতীতে সৌদি আরবে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে ইরান। বিশেষ করে সৌদির ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ছিল তেহরানের লক্ষ্যবস্তু। এরপর ইরান সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথিদের হামলার শিকার হচ্ছে রিয়াদ।
ইরান শুধু সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই নয় বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি চাপিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, হুথিরা সৌদির জাহাজের পাশাপাশি তেল পাইপলাইনের মতো স্পর্শকাতর ও কৌশলগত অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এক দশক আগে ইয়েমেনে দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হওয়া সৌদি আরব ২০২২ সালে অনেক কষ্টে সেখান থেকে নিস্তার পায়। তবে সেই পুরোনো হুমকি আবারও ফিরে এসেছে, যা শুরু সৌদিকেই নয়, বরং অন্যদের জন্যও বিপদ ডেকে আনছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে ‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে যৌথ স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে সমুদ্রপথের অপব্যবহার রোধ’ করার লক্ষ্যে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ হুথিদের দমাতে পারেনি। এরপর রিয়াদ পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি একটি বড় প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে হুথিরা শিগগিরই সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সবার সামনে তুলে ধরে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয় সৌদি। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের বিষয়ে সম্মত হলেও হুথিদের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয় নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর চীনের দুয়ারে কড়া নাড়ে সৌদি। তারা অনুরোধ করে, চীন যেন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
সম্ভবত এখন তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের সংহতি ও সহযোগিতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসতে চাইছে। গত বুধবার সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলে ভাষণ দেওয়ার সময় যুবরাজ সালমান বলেন, ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর চালানো হামলা এটাই প্রমাণ করে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অবিচ্ছেদ্য। আমরা ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে মিলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা, কৌশলগত সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অখণ্ডতা এবং যৌথ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি, যাতে জিসিসির লক্ষ্য অর্জন ও নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব হয়।’
এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ অতীতে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে আধুনিকায়ন, সিরিয়া ও কাতার কিংবা তুরস্ক—এমন নানা বিষয়েই উভয় দেশের নীতিতে মিল দেখা গেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ইসলামপন্থি মনোভাব নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত গভীর সংশয় পোষণ করলেও সৌদি আরব ‘মক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে তাকে নিজেদের বলয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। মূলত, মোহাম্মদ বিন সালমানের পরামর্শদাতা বা মেন্টর হিসেবে বিবেচনা করা হতো মোহাম্মদ বিন জায়েদকে। এমনকি এক সময় তারা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ (ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি) যোগ দেওয়ার কথাও বিবেচনা করেছিলেন।
এর আগেও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জুলাই মাসে সৌদি আরবের ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ এক্স বার্তায় লিখেছিলেন, ‘আমিরাত ও সৌদি আরবের সম্পর্ক হলো অভিন্ন ইতিহাস এবং দুই ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের মধ্যকার গভীর ও অটুট বন্ধনেরই সম্প্রসারিত রূপ, যারা একই ভাগ্যের সুতোয় বাঁধা।’
এরপর আগস্টে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ সৌদি আরবের বাদশাহ সালমানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাকে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
এদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইরান-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার জন্য সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে পুনরায় হস্তক্ষেপ বা এই অঞ্চলে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয় বরং তারা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে চাইছে যাতে তার মিত্র বা প্রক্সিরা দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি এবং ভবিষ্যৎ নীতিমালা নির্ধারণের লক্ষ্যে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তারা কোনো কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই সংঘাতের ফলে তারা নিজেরাই পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেগুলো উন্মোচন করেছে ইরান। অন্যদিকে হুথিরা সৌদি-নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা উদ্যোগগুলোর সীমাবদ্ধতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হওয়াটা অত্যন্ত যৌক্তিক। অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর জিসিসির সম্মিলিত চাপ সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের একক দাবির চেয়ে অধিক কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরব যদি ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে’ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ না দিয়েও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বা নজরদারির ক্ষেত্রে ইসরাইলের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করে, তখন সৌদির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তাই এটা বলাই যায়, সম্ভবত এই অঞ্চলে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের বা সমঝোতার আরেকটি প্রক্রিয়ার সূচনা হতে যাচ্ছে।
(ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অদিতি ভাদুরির এই লেখাটি এনডিটিভি থেকে অনুবাদ করেছেন সিনিয়র সাব-এডিটর শেখ আব্দুল্লাহ আল নোমান)