• ঢাকা বুধবার
    ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯

সিলেবাস ধরে এগোচ্ছে বিএনপি: পাস ফেল অনিশ্চিত!

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০২২, ০৪:২৪ পিএম

সিলেবাস ধরে এগোচ্ছে বিএনপি: পাস ফেল অনিশ্চিত!

আব্দুল বারী, ঢাকা

শ্রীকান্ত উপন্যাসের বড়দা বার দুয়েক এন্ট্রান্স ফেল করে পরীক্ষার পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তাই কারো সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করার ফুসরত তার ছিল না। বিএনপির অবস্থা যেন অনেকটাই সে রকম। তারাও বার দুয়েক ফেল করে এখন পাসের পড়া নিয়ে মহা ব্যস্ত। বকওয়াজ সময় নষ্ট করার সুযোগ তাদের মোটেও নেই। এই কারণেই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় বসে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় পাননি। তিনি রাজশাহীর বিভাগীয় গণসমাবেশে গিয়ে রাতের বিশ্রাম পানি করে ডয়চে ভেলেতে ২ ডিসেম্বর রাতে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

তার এই সাক্ষাৎকারটি অনেকটাই তাৎপর্যপূর্ণ। যদি ধরে নেয়া হয় তিনি দেশি কোনো সংবাদমাধ্যমকে ভরসা করতে না পেরেই বিদেশি মাধ্যমকে চয়েস করেছেন সেটাও হবে। আবার যদি ধরে নেয়া হয় যে, এটা দিয়ে তিনি দেশি সংবাদ মাধ্যমের মালিকদের রক্ষা করেছেন সেটাও হবে।

তবে তার ওই সাক্ষাৎকার যে হুট করে দেয়া নয়, এটা একেবারেই নিশ্চিত। সাক্ষাৎকারের প্রশ্নোত্তর এবং উপস্থাপকের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। ৫৬ মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান খালেদ মুহিউদ্দিন। তার উদ্দেশ্য নিয়ে কথা না বলাই ইথিক্স। তবে তিনি বিএনপির মহাসচিবকে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক বলে উভয় দিকে সুবিধা করেছেন। আগামীতে যদি বিএনপি সেটা মনে রাখে তবে এই কথার মূল্যায়ন নিশ্চয়ই তিনি পাবেন। সাক্ষাৎকারটির মাধ্যমে বিএনপির আন্দোলনের রূপরেখা পরিষ্কার হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর নিয়ে যে শংকা ছিল তা দূরীভূত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

ছিঁকের উপর দধির ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডার রস ও ঘ্রাণে টইটুম্বুর। ছিঁকে ছিড়ে পড়লেই বা ওই পর্যন্ত  যেতে পারলেই এ দধি যে তার, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ছিঁকে ছিড়ে পড়বে, নাকি সে পর্যন্ত তাকে পৌঁছাতে হবে, এটা কিন্তু রূপকল্প। সাক্ষাৎকারে ক্ষমতা হাতে পাওয়ার জন্য বিএনপি যে পরিকল্পনা করেছে তা বাস্তব, নাকি রূপকল্প তা বিশ্লেষণ করাই সিটি নিউজ ঢাকার উদ্দেশ্য।

আন্দোলন নিয়ে বিএনপি যা ভাবছে তা কতটা বাস্তবতার মুখ দেখবে তা বুঝা না গেলেও তাদের প্রতিপক্ষ যে বসে নেই তা একেবারেই পরিষ্কার। এবার যদি তারা ফেল করে তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দল অস্তিত্ব সংকটে পড়বে এটাও নিশ্চিত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক বলে প্রশংসা করে প্রশ্ন শুরু করা হয়েছে। এটা যদি ঠিক হয় তাহলে তারেক জিয়া, মির্জা আব্বাস, রিজভী কি পরিচ্ছন্ন নয়? এ প্রশ্নের উত্তর ক্লিয়ার না করলেও দোষারোপ তো এসেই গেছে।

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে তারা কিভাবে থাকবে? মির্জা ফখরুল এর উত্তর না দিয়েই ২৫ দলের সঙ্গে কথা বলার প্রসঙ্গ এনে আগের প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। বামদের প্রসঙ্গ তাচ্ছিল্য করে বলেছেন বাম ডান সবাই আছে।

২০০৮ সালে ২০ দল নেতারা বলেছিলেন (মাহামুদুর রহমান মান্না ড. কামাল হোসেনসহ আরও অনেকেই) বিএনপি তাদের অবহেলার চোখে দেখেছে। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে তারা কিভাবে থাকবে? মির্জা ফখরুল এর উত্তর না দিয়েই ২৫ দলের সঙ্গে কথা বলার প্রসঙ্গ এনে আগের প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। বামদের প্রসঙ্গ তাচ্ছিল্য করে বলেছেন বাম ডান সবাই আছে।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বন্ধন আনন্দ ও বেদনার। তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে কোনো কথা হয়নি এবং এই মুহূর্তে জামায়াত অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করার মধ্যে কি যেন লুকানো হয়েছে।    

২০০৪ সালে তারেক জিয়া টুঙ্গিপাড়ায় গিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে সন্মানিত করেছিলেন। এখন তাকে বলা হচ্ছে পাক বন্ধু এবং স্বাধীনতাবিরোধী। এই পরিবর্তন চিন্তা করে নেয়া হয়েছে কিনা?

এর উত্তর না দিয়ে তিনি বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। নাম করা আলেমরা জেলে আছেন। তাদের জ্বালাময়ী ওয়াজের শিখা নিভে গেছে। এখন এসব নিয়ে কথা বললে মূল বিষয় থেকে আমাদের ডাইভারশন হয়ে যাবে। এ প্রশ্নের উত্তরও তিনি দেননি। এতে পরিষ্কার যে, মহাসচিব হিসেবে তার নিজের বাকস্বাধীনতা নেই।

এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে না গেলে কিভাবে যাবেন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ বিলুপ্ত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। তারপর নির্বাচনে যাবেন। ১০ ডিসেম্বর এই দাবিগুলোই তুলে ধরে পরবর্তী কর্মসূচি দিবেন। এই বক্তব্যের মধ্যে বিএনপির মূল কর্মসূচির গাইডলাইন স্পষ্ট হয়েছে।  

ঢাকার সমাবেশ ডাকা হয়েছে নিত্যপণ্য ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, অন্যায়ভাবে চারজনকে হত্যা করা, ৩৫ লাখ লোকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় সমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে।

১০ ডিসেম্বরের পরে খালেদা জিয়ার কথায় দেশ চলবে। এর উত্তরে তিনি বলেছেন, ঢাকার সমাবেশ ডাকা হয়েছে নিত্যপণ্য ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, অন্যায়ভাবে চারজনকে হত্যা করা, ৩৫ লাখ লোকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকায় সমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ না করে কেন তারা পল্টনে যাবেন সে ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। স্ট্রাকচার গাছ ও একটি মাত্র প্রবেশ পথ এবং দেয়াল ঘেরা পরিবেশ সমাবেশের জন্য উপযুক্ত নয়। পল্টনের সমাবেশে লক্ষাধিক লোক তো হবেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।  

বিএনপির সমাবেশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে করার পক্ষে ১০% দর্শক হ্যাঁ বলেছেন। ৯০ ভাগ না বলছেন। এই জরিপও পক্ষপাতদুষ্ট বলে কেউ কেউ মনে করেন। 

এই সাক্ষাৎকারে ভারত প্রসঙ্গ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভারত বা অন্য দেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অধিকার বঞ্চিত হয়েছি। অন্য দেশের ভূমিকাকে সেভাবে দেখি না। মানুষ কি চায় সেটাই বড় কথা। জনশক্তি নিয়ে গণতন্ত্র আনতে চাই। অন্য দেশের উপরে নির্ভর করে নয়।

ভারত রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তারা জনগণের অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এ দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। ফ্যাসিস্ট সরকার দমন নীতির মাধ্যমে ভিন্ন মত দমন করতে চায়।

এই প্রসঙ্গে কৌশলগত উত্তর শেষ অবদি তিনি ধরে রাখতে পারেননি। আউটবাস্ট হয়ে বলেছেন, ভারত রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তারা জনগণের অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এ দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। ফ্যাসিস্ট সরকার দমন নীতির মাধ্যমে ভিন্ন মত দমন করতে চায়।

৭০ ,৭১ ও ৯০-তে জনগণের মাধ্যমে অধিকার ফিরে এসেছে। সেভাবে জনগণের মাধ্যমেই গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে চাই। ভারতের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় তারা যাবে না।

তিনি যে, ভারতের উপর চরম রুষ্ট বা ভারতকে তাদের পক্ষে রাখার প্রচেষ্টায় নেই, তা এই ধরনের উত্তরে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ভারত প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, ৭০, ৭১ ও ৯০-তে জনগণের মাধ্যমে অধিকার ফিরে এসেছে। সেভাবে জনগণের মাধ্যমেই গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে চাই। ভারতের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় তারা যাবে না।

সিলেবাস ধরে বিএনপি এগোচ্ছে।  এর অংশ হিসেবে তারা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠক ফলপ্রসূ হওয়ায় তারা উল্লসিত। জাপানি কূটনীতিক হাসিনার সরকারের সমালোচনা করেছেন। তারা ২০১৮-এর কথা ২০২২ এসে কেন বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর বাতিল হয়েছে। এটাকে তারা সাফল্য ভেবেছেন। জাপানের রাষ্ট্রদূত বাস্তব কথাই বলেছেন, এটাই বাস্তবতা। দুটি নির্বাচন তারা দেখেছেন। ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করে দেয়া হয়েছে। ২০১৮-এর নির্বাচনে ভোটের আগেই ভোট করে নেয়া হয়েছে। আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করেছেন।

রেমিটেন্স কমে গেছে। ব্যাংকিং সেক্টরে ধ্স নেমেছে বলে সরকার ও অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন। বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজাতে হবে। বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করতে চাই। এভাবে অনেকগুলো কমিশন গঠন করবেন বলে জানিয়েছেন।  

বিএনপি জিতলে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার অবর্তমানে তারেক রহমান দায়িত্ব পালন করবেন। জিতলে আইন কোনো বাধা নয়। এ কথা বলে বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে খাটো করে দিয়েছেন। আর অন্য দলকে লোভ দেখানোর ছল প্রকাশ করে ফেলেছেন।  

একদিকে বলেছেন, আন্দোলনে যারা অংশ নিবেন তাদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। অন্যদিকে বলছেন, বিএনপি জিতলে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার অবর্তমানে তারেক রহমান দায়িত্ব পালন করবেন। জিতলে আইন কোনো বাধা নয়। এ কথা বলে বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে খাটো করে দিয়েছেন। আর অন্য দলকে লোভ দেখানোর ছল প্রকাশ করে ফেলেছেন।  

আল্লাহ সহায় আছেন। আমরা আশাবাদী দানবীয় কতৃত্ববাদ যেভাবে জেঁকে বসেছে এসব সরিয়ে গণতন্ত্রকে মুক্তি দেয়া, মানুষকে মুক্তি দেয়াই আমাদের কাজ। এতে মুসলিম সেন্টিমেন্টে নাড়া মেরেছেন।    

১২ বছর আন্দোলন করেও আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে হাটানো যায়নি। কিন্তু আসাদ মারা যাওয়ার পর তার পতন হয়েছে। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ৯ বছর আন্দোলন করা হয়েছে। ডাক্তার মিলন মারা যাওয়ার পর সেই এরশাদের পতন হয়েছে।

ভারত প্রসঙ্গের পরে যে মারাত্মক কথা বলেছেন তা হলো এই যে, ১২ বছর আন্দোলন করেও আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে হাটানো যায়নি। কিন্তু আসাদ মারা যাওয়ার পর তার পতন হয়েছে। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ৯ বছর আন্দোলন করা হয়েছে। ডাক্তার মিলন মারা যাওয়ার পর সেই এরশাদের পতন হয়েছে। এই কথার মধ্যে মারাত্মকতা হলো এই যে, উনি মনে করছেন আন্দোলনে মানুষ মারা গেলেই আন্দোলন সফল। তার মানে হলো এই যে, সরকার পতনের উপাদান হিসেবে উনি চাচ্ছেন লাশ।  

১/১১ এর তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও তিনি তদারকি সরকারকে নিরাপদ বলে মনে করছেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামোকে স্থায়ী রূপ দেয়া দরকার বলে মন্তব্য করেছেন।

তার সব কথা যদি বিশ্লেষণ করে যা পাওয়া গেল তা হলো এই যে, সরকারের পদত্যাগ, তদারকী সরকার গঠন ও জাতীয় সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা।

প্রশ্ন হচ্ছে- সরকারের পদত্যাগ অত সহজ নয়। এরশাদ সরকারকে যেভাবে পদত্যাগ করানো হয়েছিল তার সঙ্গে এর ফারাক অনেক। এরশাদের জনসমর্থন থাকলেও দল তেমন মজবুত ছিল না। আওয়ামী লীগের দলীয় ভিত অনেক মজবুত। পুলিশ প্রশাসন সেনাবাহিনীর ঐক্যে ফাটল ধরানোর সুযোগও ক্ষীণ। ভারতকে বৈরী করে দূর প্রবাসের শক্তি দিয়ে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো অবস্থান দৃশ্যত বিএনপির নেই। তারপরও যদি শক্তির পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হতে পারে তা হতে পারে মিরাকল। দেখা যাক সেই মিরাকল তাদের জন্য কি সুবিধার দ্বার খুলে দেয়।

 

 

এবি/এএল

আর্কাইভ