• ঢাকা শনিবার
    ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

দূষণমুক্ত রাজধানীর পথে এবার বাস্তবায়নের পরীক্ষা

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম

দূষণমুক্ত রাজধানীর পথে এবার বাস্তবায়নের পরীক্ষা

সম্পাদকীয়

রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি এখন আর শুধু যানজট নয়; এর সঙ্গে সমানভাবে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য। প্রতিদিন লাখো মানুষ এমন এক নগরজীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যেখানে বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়া, অবিরাম হর্নের শব্দ সহ্য করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের পাশে চলাচল যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় রাজধানীর সড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও পরিবেশ দূষণকারী যানবাহন দ্রুত অপসারণ এবং বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়।

ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ পুরোনো বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। বছরের পর বছর ধরে এসব যানবাহন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের ফুসফুসও বিষিয়ে তুলছে। অন্যদিকে নির্বিচারে হর্ন বাজানোর সংস্কৃতি রাজধানীকে বিশ্বের অন্যতম শব্দদূষণপ্রবণ নগরীতে পরিণত করেছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত শব্দ মানুষের মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, ঘুমের সমস্যা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ এ বিষয়ে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়।

সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগে শুধু দূষণকারী যানবাহন অপসারণ নয়, ইটভাটার দূষণ কমানো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদন, হর্ন নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এবং রাজধানীর আরও অন্তত ৫০টি স্থানে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর পরিবেশ ও যানব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাংলাদেশে নগর ব্যবস্থাপনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, এমন ঘোষণা নতুন নয়। অতীতেও বহুবার ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে, অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরানোর নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অভিযান শিথিল হয়েছে, আর পুরোনো সমস্যাগুলো আবারও ফিরে এসেছে। ফলে প্রশ্ন একটাই—এবার কি সত্যিই পরিবর্তন হবে, নাকি এটিও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে?

ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণের ক্ষেত্রে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ প্রদান এবং সড়ক তদারকির পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে ইটভাটার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব বিবেচনায় নয়, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। হর্ন নিয়ন্ত্রণেও কেবল জরিমানা নয়, চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গণপরিবহনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে। পুরোনো যানবাহন তুলে দিলে গণপরিবহনে যেন সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক বাস দ্রুত যুক্ত করতে হবে। রাজধানীতে বৈদ্যুতিক বাস, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রসার এখন সময়ের দাবি।

ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নাগরিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এই শহরকে বাসযোগ্য করা বিলাসিতা নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এখন দেশের মানুষ দেখতে চায়—এই নির্দেশ বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয় কি না। কারণ দূষণমুক্ত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা আর কোনো স্বপ্ন নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

সম্পাদকীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ