• ঢাকা রবিবার
    ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
বিচার দাবির নতুন সমীকরণ

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কি শেষ?

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ১২:২৭ এএম

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কি শেষ?

সৈয়দ আতিক, ঢাকা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি তুলেছে এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বহুল আলোচিত প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগসংবলিত বাংলাদেশ ফাইন্যানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা পড়েছে। আদালত সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিন কি আইনের আওতায় আসতে পারেন? সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তি কি এখনো তাঁকে সুরক্ষা দেবে, নাকি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার আইনগতভাবে সম্ভব?

“৫১ অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুক”—সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য

নিজের বিরুদ্ধে বিচার দাবির প্রতিক্রিয়ায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, “কীসের বিচার করবে! সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুক।”

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনের সময় করা সরকারি কার্যাবলির জন্য আদালতে জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা দেয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, বিচার কিংবা গ্রেপ্তারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দায়মুক্তি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সংঘটিত কোনো অপরাধ বা ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালনের বাইরে থাকা অভিযোগগুলোর তদন্তে সাংবিধানিক বাধা থাকে না।

৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে কী বলছে বিএফআইইউ?

হাইকোর্টে দাখিল করা বিএফআইইউর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে জেএমসি বিল্ডার্সের মনোনীত পরিচালক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন মো. সাহাবুদ্দিন। পরে তিনি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন। এই সময়কালে ইসলামী ব্যাংক থেকে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জেএমসি বিল্ডার্সও রয়েছে।

বিএফআইইউ আরও বলেছে, সংশ্লিষ্ট ঋণের বড় অংশ এখনও পরিশোধ হয়নি। ফলে অর্থপাচার, ঋণ জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়গুলো বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।

হাইকোর্টের নির্দেশে দুদকের তদন্ত
মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানিয়েছেন, হাইকোর্ট বিএফআইইউর প্রতিবেদন আমলে নিয়ে দুদককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী বুধবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিষয়টি শুনানির জন্য রয়েছে।

দুদকের তদন্তে যদি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

শুধু ব্যাংক নয়, অর্থপাচারের অভিযোগও আলোচনায়
বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বিদেশে সম্পদ অর্জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ এবং এস আলম গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি।

সংবিধান কী বলছে?

বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন।

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সংঘটিত কোনো অভিযোগ, ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্তের ওপর এই অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা দেয় না।

অতীতের নজির কী?

বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতা ছাড়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একাধিক মামলার মুখোমুখি হন এবং কয়েকটি মামলায় দণ্ডিতও হন। একইভাবে খন্দকার মোশতাক আহমেদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল।

যদিও তাঁদের সময় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা ছিল, তবুও এসব ঘটনা দেখায় যে দায়িত্ব শেষে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চালানোর নজির বাংলাদেশে রয়েছে।

রাজনৈতিক সমীকরণ

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিচার দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার এনসিপি ও কয়েকটি রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে বিএনপি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছে। দলটির নেতারা প্রকাশ্যে বিচার দাবির পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সামনে কী?

এখন নজর হাইকোর্টের আগামী শুনানি এবং দুদকের তদন্ত কার্যক্রমের দিকে। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, আদালত কী নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী ব্যাখ্যা দেয়—তার ওপরই নির্ভর করবে এই বহুল আলোচিত ঘটনার পরবর্তী অধ্যায়।


 

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ