প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তা সংস্থা (ইএএসএ) বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা এবং ওমান উপসাগরের ওপর দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে যে সতর্কতা জারি করেছে, সেটিকে সাধারণ নিরাপত্তা নির্দেশনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। কারণ, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা আর কেবল স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নয়; আকাশপথও ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—এই চারটি উপাদান আজকের সংঘাতকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক বাহিনী যখন শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করতে সক্রিয় থাকে, তখন একই আকাশসীমা দিয়ে চলাচলকারী বেসামরিক বিমান অনিচ্ছাকৃত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। একটি ভুল শনাক্তকরণ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা সামান্য হিসাবের ভুলও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

ইতিহাস এমন আশঙ্কাকে অমূলক বলে না। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের আকাশে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের এমএইচ–১৭ গুলি করে ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হন। ২০২০ সালে ইরানের আকাশে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়; প্রাণ হারান ১৭৬ জন। এই দুটি ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক উত্তেজনার সময় বেসামরিক বিমান কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল। উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমান করিডর। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে প্রতিদিন শত শত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এই অঞ্চল ব্যবহার করে। বিশেষ করে কাতারের দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি, এবং বাহরাইনের মানামা আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হাব হিসেবে বৈশ্বিক বিমান পরিবহনের কেন্দ্রবিন্দু। এই আকাশপথে ঝুঁকি বৃদ্ধি মানে শুধু নিরাপত্তা উদ্বেগ নয়; বরং বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের সময়সূচি, জ্বালানি ব্যয়, টিকিটের মূল্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
বিমান সংস্থাগুলোর জন্যও এটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হলে ফ্লাইটের দূরত্ব বাড়বে, অতিরিক্ত জ্বালানি প্রয়োজন হবে, যাত্রাসময় দীর্ঘ হবে এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই বর্তাবে। অনেক ক্ষেত্রে টিকিটের দাম বাড়তে পারে, সংযোগ ফ্লাইটে বিলম্ব হতে পারে, এমনকি কিছু রুট সাময়িকভাবে স্থগিতও হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি বাংলাদেশি কর্মজীবী, ব্যবসায়ী ও প্রবাসী পরিবার বিভিন্ন সময়ে বিমানযোগে যাতায়াত করেন। এছাড়া ইউরোপগামী বহু ফ্লাইটও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহার করে। ফলে যেকোনো নিরাপত্তা সতর্কতা বাংলাদেশের যাত্রী, প্রবাসী এবং বিমান সংস্থাগুলোর ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই যাত্রীদের ভ্রমণের আগে নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সর্বশেষ ফ্লাইট আপডেট, সম্ভাব্য রুট পরিবর্তন এবং সময়সূচি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতপূর্ণ আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় আরও সমন্বিত তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কারণ, যাত্রীবাহী বিমানের নিরাপত্তা কোনো একটি দেশের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনোই নিরীহ যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হতে পারে না।

ইএএসএর ২৯ জুলাই পর্যন্ত জারি করা সতর্কতা হয়তো সাময়িক। কিন্তু এটি আমাদের একটি বড় বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়—বিশ্ব যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক, আকাশপথের নিরাপত্তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় আচরণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের ওপর। যুদ্ধের বিস্তার যত বাড়বে, নিরাপদ আকাশ তত সংকুচিত হবে।
বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করা এখন কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক প্রয়োজন। কারণ, একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ভুল লক্ষ্যবস্তু শুধু একটি বিমান নয়—বিশ্বের আস্থা, মানবিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ভিত্তিকেও আঘাত করতে পারে।