• ঢাকা রবিবার
    ০৯ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
পাঁচটি প্রশ্ন উদ্বেগের কেন্দ্রে

২৮ বছরেও শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নেই, ভূমি ফেরেনি—পাহাড়ে কেন এখনো অশান্তি?

প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

২৮ বছরেও শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নেই, ভূমি ফেরেনি—পাহাড়ে কেন এখনো অশান্তি?

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় তৎকালীন সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। চুক্তির পর কেটে গেছে ২৮ বছরের বেশি সময়। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের অভিযোগ—প্রতিশ্রুতির বড় একটি অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশেষ করে ভূমির অধিকার, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, স্থানীয় প্রশাসনে ক্ষমতায়ন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং নিরাপত্তা—এই পাঁচটি প্রশ্ন এখনো পাহাড়ের মানুষের উদ্বেগের কেন্দ্রে।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশন গঠন, শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হলেও বাস্তবে বহু পরিবার এখনো নিজেদের বসতভিটা ও জমি ফিরে পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমন বাস্তবতার মধ্যেই আগামীকাল রোববার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬। জাতিসংঘ এ বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-being’—বাংলায় যার অর্থ ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষা।’

ভূমি বিরোধই সবচেয়ে বড় সংকট
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পাহাড়ের মানুষের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রকৃত মালিকদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।

এ লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে গঠন করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। পরে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ২০১৬ সালে কমিশনের কার্যক্রমকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে দীর্ঘ সময়েও কমিশনের কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বহু আবেদন বছরের পর বছর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে আছে।

১০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি জ্ঞান লালের আবেদন 
রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ঘনমোড় মৌজার শিলকাটা গ্রামের জ্ঞান লাল চাকমা ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর নিজের পাঁচ একর বসতভিটা ফেরত চেয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করেন।

তার অভিযোগ, বর্তমানে ওই জমিতে পুনর্বাসিত লোকজন বসবাস করছেন। ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় নিজের জমিতে ফিরতে পারেননি তিনি। বর্তমানে পরিবার নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার দেবাছড়ি গ্রামে অন্যের ভূমিতে বসবাস করছেন জ্ঞান লাল।

তার মতো আরও বহু পরিবার নিজেদের জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অন্যের জায়গায় কিংবা অনিশ্চিত পরিবেশে বসবাস করছে বলে পাহাড়ি বিভিন্ন সূত্রের দাবি।

নিজের ভূমিতে ফিরেও জমি নেই ন্যালশনের 
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পাবলাখালি এলাকার কৃষক ন্যালশন চাকমার জীবনেও রয়েছে বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ইতিহাস। পাহাড়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে একসময় সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী জীবন কাটাতে হয় তাকে। পরে নিজ ভূমিতে ফিরলেও নিজের জমিজমা ফেরত পাননি বলে অভিযোগ তার। বর্তমানে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট এলাকায় বসবাস করছেন। জ্ঞান লাল ও ন্যালশনের মতো আরও অনেক পরিবার নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তু কিংবা ভূমিহীন জীবনের সঙ্গে লড়াই করছে।

৮০ হাজারের বেশি অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পরিবার 
শান্তিচুক্তির পর ভারত থেকে ফিরে আসা পাহাড়ি শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের চিহ্নিত ও পুনর্বাসনের জন্য সরকার টাস্কফোর্স গঠন করে।টাস্কফোর্স-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে ৮০ হাজারের বেশি পরিবার তালিকাভুক্ত রয়েছে।

অন্যদিকে ভারত থেকে প্রায় ৩৭ হাজার পরিবার ২০ দফা পুনর্বাসন প্যাকেজের মাধ্যমে ফিরে এসেছে। নিয়মিত রেশনসহ বিভিন্ন সহায়তা পেলেও তাদের অনেকেই নিজেদের পুরোনো বসতভিটা ও জমি ফিরে পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

টাস্কফোর্সের সদস্য সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, বর্তমানে চেয়ারম্যান পদটি শূন্য রয়েছে। এর আগে টাস্কফোর্সের ২৮টি বৈঠক হলেও নেওয়া সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তার দাবি, ১৯৯৭ সালের পর থেকে পাহাড়ে বিভিন্ন সহিংস ঘটনা, হামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে বহু মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

চুক্তির পরও কেন অশান্ত পাহাড়?
১৯৯৭ সালের চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা। কিন্তু চুক্তির পরও পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের খবর এসেছে।

ফলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে শান্তিচুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—চুক্তি কি কাগজে শান্তি এনেছে, নাকি মানুষের জীবনেও?চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে।

২০২৬ সালেও চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা এবং চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটিকে সক্রিয় করার দাবি উঠেছে।

সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন 
ভূমির পাশাপাশি পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর জাতিগত ও সাংবিধানিক পরিচয়ের প্রশ্নটিও দীর্ঘদিনের।পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি করে আসছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নথি ও আইনি কাঠামোয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’সহ ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। এই পরিচয়-সংক্রান্ত বিতর্ক শুধু শব্দের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূমি, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রথাগত অধিকার।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বার্তা
জাতিসংঘ প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আদিবাসী ধাত্রীদের ওপর। জাতিসংঘের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ধাত্রী মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বহন করেন।

এই বছরের প্রতিপাদ্য তাই শুধু স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আদিবাসী জ্ঞান, সংস্কৃতি, নারীর ভূমিকা এবং আন্তঃপ্রজন্মের কল্যাণ।

ঢাকায় র‌্যালি, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান 
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রোববার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য জগদীশ চন্দ্র বর্মন। অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মী খুশী কবির, সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি উষাতন তালুকদার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এবং এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদাসহ অনেকে।

এ ছাড়া রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

সমাধানের কেন্দ্রে ভূমি ও অধিকার পাহাড়ের দীর্ঘদিনের সংকট বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভূমির প্রশ্নের সমাধান ছাড়া টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, চুক্তির অসম্পূর্ণ ধারাগুলোর বাস্তবায়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও প্রথাগত অধিকারের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

পাহাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি যেন শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে না থাকে। চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাহাড়ে ফিরে আসুক নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার, মর্যাদা ও স্থায়ী শান্তি।

২৮ বছর পর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তাই পাহাড় থেকে ভেসে আসছে একটাই বড় প্রশ্ন—‘শান্তিচুক্তির প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন আর কত দূর?’

 

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ