প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান এবং স্থায়ী শান্তির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ২৮ বছরের বেশি সময় পরও তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়নি—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শান্তিচুক্তি ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক সমঝোতা নয়; এটি ছিল পাহাড়ের মানুষের নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া, উদ্বাস্তুদের পূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া এবং চুক্তির বিভিন্ন ধারার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সবচেয়ে বড় সংকট ভূমি নিয়ে।
পাহাড়ের মানুষের কাছে ভূমি কেবল বসতভিটা বা কৃষিজমি নয়। ভূমির সঙ্গে তাদের জীবিকা, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। ফলে কোনো পরিবার যখন নিজের জমি হারায় এবং বছরের পর বছর অন্যের জমিতে বসবাস করতে বাধ্য হয়, তখন শুধু একজন ব্যক্তি নয়—একটি পরিবার, কখনো একটি সম্প্রদায়ের জীবনব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়েছিল এই সংকটের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান হিসেবে। কিন্তু কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও অকার্যকারিতার অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি শান্তিচুক্তির মৌলিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় বাধা।
একজন মানুষ যদি ১০ বছর আগে নিজের জমি ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, অথচ আজও সেই আবেদনের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা কতটা অটুট থাকবে—এই প্রশ্ন আমাদের ভাবতে হবে।
একইভাবে, যারা সংঘাতের কারণে নিজ ভূমি ছেড়ে শরণার্থী বা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনও শুধু খাদ্য বা আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত পুনর্বাসনের অর্থ হলো নিরাপদ পরিবেশে মর্যাদার সঙ্গে নিজের ভূমি ও জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ।
শান্তিচুক্তির ২৮ বছর পরও যদি বহু পরিবার নিজেদের পুরোনো বসতভিটায় ফিরতে না পারে, তবে সেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা।পাহাড়ের মানুষকে কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক বা সশস্ত্র আধিপত্যের ভয় নিয়ে বসবাস করতে হবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কার্যক্রমও হতে হবে আইন, মানবাধিকার ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে।
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু কোনো একটি পক্ষের নয়। সরকার, রাজনৈতিক দল, স্থানীয় নেতৃত্ব, আঞ্চলিক সংগঠন এবং পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—পাহাড়ের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার অর্থ অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করা নয়। বরং ন্যায়সংগত ভূমি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ প্রশাসন, আইনের শাসন এবং সবার সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের ভিত্তি।
পরিচয়ের প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের যে পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়, সেই পরিচয়, সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যকে সম্মান করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্যেই এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্যে আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান, জীবন ও কল্যাণের বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মূলত একটি বৃহত্তর বার্তাই দিচ্ছে—কোনো জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক সূচকে পরিমাপ করা যায় না; তাদের সংস্কৃতি, জ্ঞান, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও প্রজন্মান্তরের কল্যাণও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। পাহাড়ে রাস্তা হবে, পর্যটন বাড়বে, অবকাঠামো উন্নত হবে—এগুলো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে যদি পাহাড়ের মানুষ না থাকে, যদি ভূমি নিয়ে বিরোধের সমাধান না হয়, যদি মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় থাকে, তাহলে উন্নয়নের সুফল পূর্ণতা পাবে না।
আমরা মনে করি, এখন আর শুধু শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করতে হবে। দীর্ঘদিনের আবেদনগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃত উদ্বাস্তুদের চিহ্নিত করে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমানভাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকারকে পাহাড়ের মানুষের সঙ্গে সরাসরি ও নিয়মিত সংলাপে বসতে হবে।
২৮ বছর একটি রাষ্ট্রীয় চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য কম সময় নয়। একটি প্রজন্মের জীবন পার হয়ে গেছে। যারা ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ বৃদ্ধ। নতুন প্রজন্ম জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে—কিন্তু তাদের কাছেও ভূমি, পরিচয়, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে একই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সব পক্ষের দায়িত্বশীলতা।
শান্তিচুক্তি যেন ইতিহাসের পাতায় আটকে থাকা একটি দলিল না হয়। এর প্রতিটি ন্যায্য প্রতিশ্রুতি পাহাড়ের মানুষের জীবনে দৃশ্যমান বাস্তবতায় পরিণত হোক—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
কারণ পাহাড়ে শান্তি মানে শুধু বন্দুকের নীরবতা নয়। পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি মানে—নিরাপদ জীবন, নিজের ভূমিতে থাকার অধিকার, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিশ্চিন্ত আগামী।