প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ১১:৪৯ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই তহবিলের আওতায় তরুণ উদ্যোক্তাদের কম সুদে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সময়মতো ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসার ভালো পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ ও ৫০০ কোটি টাকা অনুদানের মাধ্যমে অন্তত ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—এখানে শুধু অর্থ দেওয়ার চিন্তা করা হয়নি; বরং একজন তরুণ উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করা থেকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং ভালো করলে আরও অর্থ পাওয়ার সুযোগ দেওয়ার একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ তরুণদের মধ্যে কম নয়। কিন্তু আগ্রহ ও সক্ষমতার মাঝখানে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো মূলধন। ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে জামানত, উচ্চ সুদ, জটিল প্রক্রিয়া এবং ব্যবসার অভিজ্ঞতার ঘাটতি অনেক সম্ভাবনাময় তরুণকে শুরুতেই পিছিয়ে দেয়। ফলে চাকরি খোঁজার প্রবণতা বাড়ে, অথচ উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব, তার সুযোগটি কাজে লাগানো যায় না।
প্রস্তাবিত তহবিল এই জায়গায় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ এবং ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে। তবে শুধু ঋণের সুদ কমালেই হবে না। অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করাও জরুরি।
কারণ আমাদের দেশে ভালো উদ্যোগের অভাব যতটা নয়, তার চেয়ে বড় সমস্যা হলো সঠিক ব্যক্তির কাছে সঠিক সময়ে অর্থ পৌঁছানো।
এই জায়গায় উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাছাইয়ের পরিকল্পনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ৫০০টির বেশি উপজেলায় সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা চিহ্নিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থায়নের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। একজন তরুণ উদ্যোক্তা শহরে জন্মেছেন কি না, তাঁর বড় সম্পদ আছে কি না—এসব নয়; তাঁর ব্যবসার সম্ভাবনা, দক্ষতা, সততা ও উদ্যোগের বাস্তবতা হওয়া উচিত ঋণ পাওয়ার প্রধান মানদণ্ড।
এখানে সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গাও রয়েছে।
যদি রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব, ব্যাংকারদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা তদবিরের ভিত্তিতে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হয়, তাহলে এই ১ হাজার কোটি টাকার উদ্যোগও অতীতের অনেক ঋণ কর্মসূচির মতো ব্যর্থ হতে পারে। বরং তখন প্রকৃত উদ্যোক্তারা বাদ পড়বেন এবং অর্থ চলে যাবে এমন ব্যক্তিদের হাতে, যাঁদের ব্যবসা করার প্রকৃত সক্ষমতা নেই।
তাই উদ্যোক্তা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আবেদন, যাচাই, অনুমোদন, ঋণের ব্যবহার এবং ব্যবসার অগ্রগতি—প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুদান।
সময়মতো ঋণ পরিশোধ করলে এবং ব্যবসা ভালো করলে ঋণের সমপরিমাণ পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ একজন উদ্যোক্তার জন্য বড় প্রণোদনা হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভালো ঋণ সংস্কৃতি তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অনুদান যেন নতুন ধরনের অপচয় বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি না করে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
অনুদান দেওয়ার আগে ব্যবসার প্রকৃত আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর ও হিসাব ব্যবস্থাপনা, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং ব্যবসার স্থায়িত্ব যাচাই করা যেতে পারে। অর্থাৎ অনুদান যেন ‘পুরস্কার’ হয়, কিন্তু ‘বিনা শর্তের টাকা’ না হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন তরুণকে ১০ লাখ টাকা ঋণ দিলেই তিনি সফল উদ্যোক্তা হয়ে যাবেন না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, বাজারের সঙ্গে সংযোগ, হিসাবরক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং ব্যবসায়িক পরামর্শ। তাই অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক ব্যবস্থাও চালু করা জরুরি।
বিশেষ করে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প, শতরঞ্জি ও স্থানীয় উৎপাদনের মতো খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে শুধু ঋণ দিলেই হবে না; উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে হবে। একজন উদ্যোক্তা পণ্য তৈরি করলেন, কিন্তু বিক্রি করতে পারলেন না—তাহলে ঋণ পরিশোধ করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
সুতরাং এই তহবিলকে শুধু ‘ঋণ বিতরণ কর্মসূচি’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে করতে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি’।
আমরা চাই, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু ৫ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি না হোক; বরং সেই ৫ হাজার উদ্যোক্তার হাত ধরে আরও কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হোক। একজন সফল উদ্যোক্তা যেন পরবর্তী সময়ে আরও ১০ জন, ২০ জন বা ৫০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন—নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।
বাংলাদেশের তরুণরা শুধু চাকরি খুঁজবেন—এমন অর্থনীতি আমাদের প্রয়োজন নেই। বরং এমন অর্থনীতি দরকার যেখানে তরুণরা চাকরি তৈরি করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হতে পারে। তবে অর্থের পরিমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—অর্থটি কার হাতে যাচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এবং সেই অর্থ থেকে কতটা টেকসই ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।
তরুণদের হাতে অর্থ দেওয়া সহজ; তাদের হাতে সেই অর্থ দিয়ে টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করার সুযোগ দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের ব্যাংকগুলোকে সেই কঠিন কাজটিই সফলভাবে করতে হবে।
এই ১ হাজার কোটি টাকা যেন আরেকটি ঋণ কর্মসূচি হয়ে না থাকে; এটি যেন হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোক্তা প্রজন্ম তৈরির ভিত্তি—এটাই প্রত্যাশা।