প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে লেবানন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দেশটির পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার ভোটে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের সংশোধনী অনুমোদন করা হয়। এর ফলে দেশটির আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আর থাকছে না। একই সঙ্গে বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের পথ তৈরি হয়েছে। 
লেবাননের ১২৮ সদস্যের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিলটি পাস হয়। তবে দেশটির শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লক এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। বিল পাসের পর লেবাননের বিচারমন্ত্রী আদেল নাসসার এটিকে দেশের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। 
নতুন আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কার্যকর হবে। বিদ্যমান মৃত্যুদণ্ডগুলোও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হবে। কিছু ক্ষেত্রে কঠোর শ্রমসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। 
লেবাননে অবশ্য ২০০৪ সাল থেকেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর কার্যত একটি স্থগিতাদেশ ছিল। অর্থাৎ গত ২২ বছরে দেশটিতে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। তবে আইনে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় আদালতগুলো এ ধরনের সাজা দিয়ে আসছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা কারাগারে ছিলেন। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে এমন বন্দির সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪ জন; লেবাননের সরকারি হিসাবে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫। 
মৃত্যুদণ্ড বাতিলের ফলে এখন ওই বন্দিদের ভবিষ্যৎ সাজা নিয়ে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে দেশটির কারাগারগুলো আগে থেকেই ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দির চাপ এবং অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি যাবজ্জীবন ও কঠোর শ্রমের সাজা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লেবাননের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি কঠোর শ্রমের শাস্তির বিধান নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে। 
মানবাধিকার সংগঠনগুলো লেবাননের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এটিকে মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়ে অঞ্চলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 
তবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের বিরোধিতা বিষয়টিকে রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলোর যুক্তি, ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ও সহিংস অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করলে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠতে পারে।
এর পাশাপাশি লেবাননের পার্লামেন্টে ১৯৯০ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সাধারণ ক্ষমা আইনগুলোর একটি নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত ওই আইনের আওতায় কিছু সহিংস অপরাধে দণ্ডিত বন্দির সাজা কমানো বা মুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে। নিহত সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পরিবার এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের আশঙ্কা, মৃত্যুদণ্ড বাতিল এবং সাধারণ ক্ষমার উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত কিছু ব্যক্তি তুলনামূলকভাবে দ্রুত কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতে পারেন।
লেবাননের জন্য তাই মৃত্যুদণ্ড বাতিলের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি শাস্তি বিলোপের ঘটনা নয়; এটি দেশটির বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার, কারাগার ব্যবস্থাপনা এবং গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্মিলনের প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে এনেছে।
দীর্ঘদিনের কার্যত স্থগিতাদেশের পর এবার মৃত্যুদণ্ডকে আইনের বই থেকেই বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে লেবানন আরব বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করল।