প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
অপেশাদারদের তুলনায় পেশাদার বডিবিল্ডারদের আকস্মিক হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি পাঁচ গুণেরও বেশি- বলা হয়েছে একটি গবেষণায়। সংগৃহীত ছবি
শক্তিশালী শরীর, বিশাল পেশি, কম শরীরের চর্বি—দেখতে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক মনে হলেও প্রতিযোগিতামূলক বডিবিল্ডিংয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি। অ্যানাবলিক স্টেরয়েড, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা এবং জেনেটিক হৃদ্রোগ—সব মিলিয়ে কিছু বডিবিল্ডারের ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই তৈরি হতে পারে প্রাণঘাতী জটিলতা।
পেশিবহুল ও শক্তিশালী শরীরকে সাধারণত সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ বডিবিল্ডারদের আকস্মিক মৃত্যুর কয়েকটি ঘটনা সেই ধারণার সামনে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
এই মাসের শুরুতেই ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাহিয়া অঙ্গরাজ্যে ৩৫ বছর বয়সী বডিবিল্ডার ও ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার মেইলসন আরাউজোর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি জিমে নিজের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ছবিতে তার বিশাল বাহুর পেশি ও অত্যন্ত গঠিত শরীরই ছিল চোখে পড়ার মতো।
পরে বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন মানুষ বাইরে থেকে যতটা শক্তিশালী ও সুস্থ দেখান, তার হৃদ্যন্ত্রও কি ততটাই সুস্থ থাকে?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন একই ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনা সামনে আসে।
গত মে মাসের শেষ দিকে ব্রাজিলের তরুণ বডিবিল্ডার গ্যাব্রিয়েল গানলি মাত্র ২২ বছর বয়সে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত সমস্যায় মারা যান। এর আগের বছর ব্রাজিলের আরও দুই বডিবিল্ডার—যাদের বয়স ছিল ৩০ ও ৪০ বছর—হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় মারা যান। তাদের একজন প্রতিযোগিতার সময়ই মৃত্যুবরণ করেন।
ব্রাজিলের বাইরে এমন ঘটনার উদাহরণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বডিবিল্ডার ডালাস ম্যাককারভার ২০১৭ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে মারা যান। জার্মান ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার ও বডিবিল্ডার জো লিন্ডনার ২০২৩ সালে ৩০ বছর বয়সে মারা যান।
তবে এসব মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বডিবিল্ডারদের অকালমৃত্যুর পেছনে জেনেটিক হৃদ্রোগ, অতিরিক্ত শারীরিক চাপ, অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস, ডিহাইড্রেশন এবং বিশেষ করে অ্যানাবলিক স্টেরয়েডসহ কর্মক্ষমতা-বর্ধক ওষুধের ব্যবহার—একটি বা একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
গবেষণা কী বলছে?
প্রতিযোগিতামূলক বডিবিল্ডিংয়ের ঝুঁকি নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
গবেষকেরা ২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রায় ২০ হাজার অপেশাদার ও পেশাদার বডিবিল্ডারকে অনুসরণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, পেশাদার বডিবিল্ডারদের আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি অপেশাদার প্রতিযোগীদের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি।
গবেষণায় মোট ১২১টি মৃত্যু শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৬টি ঘটনাকে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
মৃত্যুর সময় তাদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৪৫ বছর। তবে যারা সক্রিয়ভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৪ দশমিক ৭ বছর।
গবেষণার প্রধান লেখক ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পদুয়ার ড. মার্কো ভেকিয়াতোর মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিকারী ওষুধের ব্যাপক ব্যবহার, প্রতিযোগিতার আগে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা এবং অত্যন্ত উচ্চমাত্রার শক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কি অ্যানাবলিক স্টেরয়েড?
বডিবিল্ডিংয়ে দ্রুত পেশি বাড়ানো এবং শরীরের চর্বি কমানোর আকাঙ্ক্ষা অনেককে অ্যানাবলিক-অ্যান্ড্রোজেনিক স্টেরয়েডের দিকে নিয়ে যায়।
এগুলো টেস্টোস্টেরনের মতো হরমোনের কার্যক্রম অনুকরণ করে এবং পেশির বৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধার দ্রুত করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ডেনমার্কের একটি গবেষণায় অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচিত ১,১৮৯ জন পুরুষকে প্রায় ১১ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের সঙ্গে প্রায় ৬০ হাজার সাধারণ পুরুষের তুলনা করা হয়েছিল।
গবেষণায় স্টেরয়েড ব্যবহারকারীদের কার্ডিওমায়োপ্যাথির ঝুঁকি প্রায় নয় গুণ বেশি পাওয়া যায়।
কার্ডিওমায়োপ্যাথি হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে হৃদ্পেশির গঠন বা কার্যক্ষমতায় সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে হৃদ্যন্ত্র স্বাভাবিকভাবে রক্ত পাম্প করতে ব্যর্থ হতে পারে।
স্টেরয়েড ব্যবহারকারীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও প্রায় তিন গুণ এবং হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি তিন গুণের বেশি ছিল।
তবে গবেষণাগুলো থেকে এটাও মনে রাখা জরুরি—প্রতিটি বডিবিল্ডারের মৃত্যু স্টেরয়েডের কারণে হয়েছে, এমন দাবি করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
হৃদ্যন্ত্র কেন বড় হয়ে যায়?
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ব্যায়াম করলে হৃদ্যন্ত্রও শরীরের চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। নিয়মিত ওজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য শারীরিক অনুশীলনের ফলে হৃদ্যন্ত্রের কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন স্বাভাবিক অভিযোজনের অংশ হতে পারে।
কিন্তু অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, জেনেটিক প্রবণতা এবং অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের মতো উপাদান একসঙ্গে থাকলে এই পরিবর্তন ক্ষতিকর পর্যায়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের বাম নিলয়ের দেয়াল অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে গেলে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যক্রম এবং রক্ত পাম্প করার ক্ষমতায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এতে অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন বা অ্যারিথমিয়া দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
‘বড় হার্ট’ সবসময় ভালো হার্ট নয়
শরীরের বাইরের পেশি যত বড় হয়, সাধারণ মানুষের চোখে তাকে তত শক্তিশালী মনে হয়। কিন্তু হৃদ্যন্ত্রের ক্ষেত্রে একই যুক্তি সবসময় প্রযোজ্য নয়।
হৃদ্যন্ত্রের পেশি কিছুটা শক্তিশালী ও দক্ষ হওয়া স্বাভাবিক ব্যায়ামজনিত অভিযোজন হতে পারে। কিন্তু যখন পেশি অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে যায়, তখন হৃদ্যন্ত্রের ভেতরের প্রকোষ্ঠে রক্ত ভরার জায়গা কমে যেতে পারে এবং এর বৈদ্যুতিক স্থিতিশীলতাও বিঘ্নিত হতে পারে।
ফলে একজন ব্যক্তি বাইরে থেকে অত্যন্ত ফিট দেখালেও তার হৃদ্যন্ত্রের ভেতরে গুরুতর সমস্যা থাকতে পারে।
ডালাস ম্যাককারভারের হৃদ্যন্ত্রের ঘটনা কেন আলোচিত?

২০১৭ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে মারা যান যুক্তরাষ্ট্রের বডিবিল্ডার ডালাস ম্যাককারভার।
তার মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তে তার হৃদ্যন্ত্রের ওজন ছিল প্রায় ৮৩৩ গ্রাম—একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের স্বাভাবিক হৃদ্যন্ত্রের ওজনের তুলনায় যা অত্যন্ত বেশি।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, অত্যন্ত বেশি পেশিবহুল শরীরের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের পরিবর্তনও যুক্ত হতে পারে।

২০২২ সালের একটি পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের মৃত বডিবিল্ডারদের ময়নাতদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের হৃদ্যন্ত্রের ওজন গড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি ছিল। একই সঙ্গে বাম নিলয়ের দেয়ালও স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পুরু ছিল।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে—এই গবেষণাগুলো মূলত মৃত বডিবিল্ডারদের তথ্য নিয়ে করা হয়েছে। তাই এগুলো দেখে জীবিত প্রতিটি বডিবিল্ডারের হৃদ্যন্ত্র একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
জেনেটিক হৃদ্রোগও বড় কারণ হতে পারে
বডিবিল্ডারের হৃদ্যন্ত্রের পরিবর্তন দেখলেই স্টেরয়েডকে দায়ী করা ঠিক নয়।
কিছু মানুষের জন্মগতভাবেই হৃদ্পেশি অস্বাভাবিকভাবে পুরু হওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। একে হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি বলা হয়।
এই রোগ অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। একজন তরুণ মানুষ নিয়মিত জিম করতে পারেন, প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন এবং বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখাতে পারেন।
কিন্তু অতিরিক্ত শারীরিক চাপের সময় তার হৃদ্যন্ত্রে মারাত্মক অ্যারিথমিয়া তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা বলেন, বডিবিল্ডারের হৃদ্যন্ত্রের অস্বাভাবিক পুরুত্বের পেছনে তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন—
জেনেটিক রোগ, প্রশিক্ষণজনিত পরিবর্তন এবং অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের প্রভাব।
অনেক ক্ষেত্রে এই তিনটির একাধিক কারণ একসঙ্গেও থাকতে পারে।
শুধু স্টেরয়েড নয়, প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে
বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতার আগে অনেক প্রতিযোগী খুব দ্রুত শরীরের চর্বি ও পানি কমানোর চেষ্টা করেন।
এর জন্য খাবার, পানি ও কার্বোহাইড্রেট গ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হতে পারে। শরীর থেকে পানি কমে গেলে ডিহাইড্রেশন ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে।
সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য ইলেকট্রোলাইট হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই চরম পর্যায়ের ডিহাইড্রেশন বা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা থাকলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হৃদ্স্পন্দনের মারাত্মক অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যদি উচ্চমাত্রার প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষমতা-বর্ধক ওষুধ যোগ হয়, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
স্টেরয়েড হৃদ্যন্ত্র ছাড়াও শরীরের কোথায় আঘাত করে?
অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের সম্ভাব্য ক্ষতি শুধু হৃদ্যন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়।
দীর্ঘমেয়াদি বা অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—
• উচ্চ রক্তচাপ
• রক্তে কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
• ধমনিতে প্লাক জমার ঝুঁকি বৃদ্ধি
• হৃদ্যন্ত্রের গঠনগত পরিবর্তন
• হৃদ্যন্ত্রের পাম্পিং ক্ষমতা কমে যাওয়া
• প্রজননক্ষমতায় সমস্যা
• শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া
• যৌনক্ষমতার সমস্যা
• হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন
• মেজাজ ও ঘুমের সমস্যাসহ বিভিন্ন মানসিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অর্থাৎ শরীরের পেশি দ্রুত বড় হলেও তার অর্থ এই নয় যে শরীরের সব অঙ্গ একইভাবে সুস্থ রয়েছে।
‘সাইক্লিং’ করলেই কি ঝুঁকি কমে?
কিছু ব্যবহারকারী মনে করেন, কয়েক সপ্তাহ স্টেরয়েড নেওয়ার পর কিছুদিন বন্ধ রাখলে শরীর ক্ষতি থেকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। এই পদ্ধতিকে সাধারণভাবে ‘সাইক্লিং’ বলা হয়।
সাবেক বডিবিল্ডার রদ্রিগো গোয়েস জানিয়েছেন, তিনি ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে প্রতিযোগিতা করার পর চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে স্টেরয়েড সাইকেল শুরু করেছিলেন।

তার নিজের অভিজ্ঞতায় দ্রুত পেশি বৃদ্ধি হলেও চুল পড়া, মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং রাতের অতিরিক্ত ঘামের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
পরে তিনি স্টেরয়েড অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন।
তবে ‘সাইক্লিং’ করলেই অ্যানাবলিক স্টেরয়েড নিরাপদ হয়ে যায়—এমন বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই।
বরং ঝুঁকি কতটা হবে, তা নির্ভর করতে পারে ব্যবহৃত পদার্থ, মাত্রা, ব্যবহারের সময়কাল, একাধিক ওষুধের সংমিশ্রণ এবং ব্যক্তির পূর্ববর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর।
কেন বাইরে থেকে বোঝা যায় না?
বডিবিল্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় বিভ্রমগুলোর একটি হলো—দেখতে ফিট মানেই ভেতর থেকে সুস্থ।
একজন মানুষের শরীরে খুব কম চর্বি থাকতে পারে, পেশি অত্যন্ত উন্নত হতে পারে এবং তার দৈনন্দিন কর্মক্ষমতাও ভালো হতে পারে। কিন্তু তার রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, হৃদ্যন্ত্রের গঠন কিংবা বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে সমস্যা থাকতে পারে।
বিশেষ করে কিছু হৃদ্রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে।
তাই শুধু আয়নায় নিজের শরীর দেখা বা জিমে কত ভার তোলা যাচ্ছে—এসব দিয়ে হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না।

তাহলে বডিবিল্ডারদের কী করা উচিত?
যারা নিয়মিত ভারী ওজনের প্রশিক্ষণ করেন, বিশেষ করে যারা প্রতিযোগিতামূলক বডিবিল্ডিং করেন, তাদের জন্য শুধু পেশি ও শরীরের চর্বির দিকে নজর দেওয়া যথেষ্ট নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে নিয়মিত—
রক্তচাপ, রক্তের শর্করা, কোলেস্টেরল, কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা এবং হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
কারও পরিবারে অল্প বয়সে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
বুক ধড়ফড়, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা ব্যায়ামের সময় অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে ব্যায়ামের সময় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা বুকে চাপ/ব্যথা অনুভূত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
মূল কথা
বডিবিল্ডিং নিজে কোনো ‘মৃত্যুঝুঁকির খেলা’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। নিয়মিত ও পরিকল্পিত ব্যায়াম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ঝুঁকি তৈরি হয় যখন পেশি বড় করার প্রতিযোগিতা শরীরের স্বাভাবিক সীমাকে অতিক্রম করে যায়—বিশেষ করে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড বা অন্যান্য কর্মক্ষমতা-বর্ধক পদার্থের অপব্যবহার, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, চরম খাদ্য ও পানি নিয়ন্ত্রণ এবং অজানা হৃদ্রোগের সঙ্গে এগুলো একত্রিত হলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাইসেপ যত বড়ই হোক, সেটি হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতার প্রমাণ নয়।
একজন মানুষকে বাইরে থেকে ‘সুপারহিরো’র মতো দেখাতে পারে তার পেশি। কিন্তু সেই পেশির আড়ালে থাকা হৃদ্যন্ত্রের অবস্থা জানতে প্রয়োজন চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা—শুধু আয়না নয়।
তাই শরীর গড়ার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বড় পেশি নয়; দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ হৃদ্যন্ত্রসহ একটি ভারসাম্যপূর্ণ শরীর।