প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ১০:০৮ এএম
জুলাই আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার নির্দেশনা সংক্রান্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের কথোপকথনের নতুন অডিও রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এসব অডিও রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর আগে সোমবার (১০ আগস্ট) একই মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদের আরও কয়েকটি অডিও ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের দাবি, এসব কথোপকথনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ও পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা সহিংসতা, তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া এবং জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশনার কথাও রয়েছে।
‘পাল্টা আগুন’ দেওয়ার কথা ফোনালাপে
ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে শেখ হাসিনা ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের মধ্যে একটি ফোনালাপ হয়।
ওই কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, আন্দোলনকারীরা আগুন দিলে তাদের বাড়িঘর ও গাড়িতে ‘পাবলিক দিয়ে’ আগুন দেওয়ার কথা। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘তোরাও পুড়াবি, আয় আমরাও পুড়াব।’
প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, হাছান মাহমুদ ওই বক্তব্যকে ‘টিট ফর ট্যাট’ বা পাল্টা জবাব দেওয়ার নীতি হিসেবে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, গায়েবানা জানাজা পড়ে তারা দ্রুত বিভিন্ন মহল্লায় চলে যাবেন।
তখন শেখ হাসিনা তাকে সংশোধন করে মহল্লার পরিবর্তে যার যার এলাকায় যাওয়ার কথা বলেন। একইসঙ্গে তিনি সংসদ সদস্যদের ডেকে নিজ নিজ এলাকায় ‘প্রোটেকশনের’ ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদেরকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করার নির্দেশ
ওই কথোপকথনের পর শেখ হাসিনার সঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথন হয় বলে প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফোনালাপে সেতু ভবনে আগুন দেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে। শেখ হাসিনা সেখানে র্যাব পাঠানোর কথা বলেন। একইসঙ্গে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার নির্দেশনার কথাও উঠে আসে।
ফোনালাপের অনুলিপিতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়—‘আমাদেরও বাড়ি ঘরে আগুন দিচ্ছে, ওদের বাড়ি ঘরে আগুন পাবলিক দিবে। ওদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কী কী আছে খুঁজে বের কর।’
প্রসিকিউশনের দাবি, এই কথোপকথন থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা ও সহিংসতার একটি পরিকল্পিত নির্দেশনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশের অডিওও দাখিল
এর আগে সোমবার (১০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ শেখ হাসিনার আরও একটি ফোনালাপের অডিও উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। ওই কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার দায় অন্যদের ওপর চাপানোর বিষয়ে কথোপকথনের একটি অডিওও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এসব ফোনালাপ জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং আন্দোলন দমনে তৎকালীন শীর্ষ পর্যায়ের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
ট্রাইব্যুনালে অডিও উপস্থাপন
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে প্রসিকিউশনের পক্ষে এসব অডিও উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
তিনি অডিওগুলোর বিভিন্ন অংশের বিষয়বস্তু তুলে ধরে প্রসিকিউশনের বক্তব্য ও যুক্তি উপস্থাপন করেন। শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট ফোনালাপের কথোপকথনের অনুলিপিও সাংবাদিকদের দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের এসব কথোপকথন হয়।
জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তী সময়ে ব্যাপক ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পরে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাগুলোর তদন্তের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক অভিযোগ ও মামলা নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও হাছান মাহমুদসহ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব মামলায় প্রসিকিউশন বিভিন্ন নথি, সাক্ষ্য, অডিও-ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করছে।
তবে ট্রাইব্যুনালে কোনো অডিও বা নথি উপস্থাপন করা হয়েছে মানেই সেটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় শেষ পর্যন্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
মঙ্গলবারের শুনানিতে নতুন অডিও ফোনালাপ দাখিলের মধ্য দিয়ে জুলাই আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা নিয়ে বিচারিক কার্যক্রমে আরও কিছু নতুন তথ্য যুক্ত হলো।