• ঢাকা মঙ্গলবার
    ১১ আগস্ট, ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ

এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে তেল, হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাড়ছে সরবরাহ-ঝুঁকি

প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ১০:২৭ এএম

এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে তেল, হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাড়ছে সরবরাহ-ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি চুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ দশমিক ৮১ ডলারে স্থির ছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৮২ দশমিক ২০ ডলার। এ অবস্থান গত এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে তেলের দামের সর্বোচ্চ পর্যায়গুলোর একটি।  

এর আগে সোমবার তেলের বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই দিন ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এতে ৩১ জুলাইয়ের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।  

কেন হঠাৎ বাড়ছে তেলের দাম

তেলের বাজারে সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দুই পক্ষের অবস্থান ও শর্তের মধ্যে পার্থক্য এখনো বড় হওয়ায় দ্রুত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়েছে

ফলে বাজারে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—কবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে।

এই অনিশ্চয়তাই তেলের দামে অতিরিক্ত ‘ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যোগ করছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা বর্তমান দামেই বাড়তি মূল্য পরিশোধ করতে প্রস্তুত হচ্ছেন।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

এই পথ দিয়ে তেল ও গ্যাসের বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু তেলের দাম নয়, বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের উদ্বেগ হচ্ছে—শান্তি চুক্তি হলেও হরমুজ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত শুরু হবে। কারণ চুক্তি ও বাস্তব সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকতে পারে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালও এর আগে সতর্ক করেছিল যে হরমুজ পুনরায় খুলে গেলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।  

ইরানের শর্ত, ট্রাম্পের অবস্থান

ইরান যুদ্ধের অবসান, ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকানোর নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন শর্তের ওপর জোর দিচ্ছে। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও আলোচনায় এসেছে।  

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি ও স্বার্থের বিষয়টি সামনে আনছেন। ফলে দুই পক্ষের দাবিদাওয়ার মধ্যে দূরত্ব কমছে না।

এই অবস্থান শান্তি চুক্তির পথকে জটিল করে তুলেছে। বাজারের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—সমঝোতা যত বিলম্বিত হবে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সময়ও তত পিছিয়ে যেতে পারে।

আগের সমঝোতার পরও কেন উদ্বেগ কাটছে না

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এর আগে সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল। ওই কাঠামোয় সামরিক অভিযান বন্ধ এবং হরমুজে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ও ছিল। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থেকে যায়।  

ফলে বাজারে প্রাথমিকভাবে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি স্থায়ী হয়নি। বরং সাম্প্রতিক আলোচনায় নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় তেল ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি আবারও হিসাবের মধ্যে আনছেন।

একদিনে ৫ শতাংশের বেশি দাম বৃদ্ধি

সোমবারের বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির মাত্রা ছিল উল্লেখযোগ্য। ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই উভয়ের দামই ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এর ফলে জুলাইয়ের শেষ দিনের পর তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।  

মঙ্গলবারও বাজারে সেই উচ্চমূল্য ধরে রাখা হয়েছে। ব্রেন্ট ৮৭ ডলারের ওপরে এবং ডব্লিউটিআই ৮২ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে।  

এতে বোঝা যাচ্ছে, সোমবারের মূল্যবৃদ্ধি শুধু সাময়িক বাজার প্রতিক্রিয়া ছিল না; হরমুজ ও ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এখনো বহাল রয়েছে।

তেলের দাম বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে

অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন এবং পণ্য সরবরাহের খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কয়েক দিনের জন্য বাড়লেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার ও ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখেন।

এশিয়ার বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে

এশিয়ার বহু দেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ফলে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক নৌচলাচল এ অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে এশিয়ার শোধনাগারগুলোতে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। তখন বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, চলমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল কত দ্রুত পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়।

সামনে কোন দিকে যেতে পারে তেলের বাজার

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে তেলের বাজার এখন মূলত তিনটি বিষয়ের দিকে তাকিয়ে আছে—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালির বাস্তব পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের স্বাভাবিকতা।

যদি দ্রুত সমঝোতা হয় এবং হরমুজ দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হয়, তাহলে সরবরাহ-ঝুঁকি কমে তেলের দামে চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে আলোচনা ভেঙে গেলে বা হরমুজের পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম আবারও দ্রুত বাড়তে পারে।

অর্থাৎ বর্তমান বাজারে তেলের দামের গতিপথ শুধু চাহিদা ও সরবরাহের প্রচলিত হিসাবের ওপর নির্ভর করছে না; মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিই এখন বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে।

বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট তেল ইতোমধ্যে ৮৭ ডলারের ওপরে এবং ডব্লিউটিআই ৮২ ডলারের আশপাশে থাকায় আগামী দিনগুলোতে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রতিটি অগ্রগতি বা ব্যর্থতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তেলের বাজারে দেখা যেতে পারে।  

আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ