• ঢাকা বুধবার
    ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
১ হাজার কোটি টাকার তহবিল

কম সুদে ও জামানত ছাড়াই ১০ লাখ টাকা ঋণ, লক্ষ্য ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি

প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম

কম সুদে ও জামানত ছাড়াই ১০ লাখ টাকা ঋণ, লক্ষ্য ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল থেকে তরুণ উদ্যোক্তাদের কম সুদে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি সময়মতো ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসার ভালো পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ এবং ৫০০ কোটি টাকা অনুদানের মাধ্যমে অন্তত ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের বিষয়ে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে মঙ্গলবার বিকেলে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। বৈঠকে তহবিলের কাঠামো, উদ্যোক্তা নির্বাচন, ঋণের সুদহার, অনুদান এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রকৃত উদ্যোক্তা চিহ্নিত করার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সাংবাদিকদের জানান, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ও অনুদান প্যাকেজ নিয়ে কাজ চলছে। যেসব তরুণ ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে উদ্যোগ নিতে পারছেন না, তাঁদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন। এ ঋণের সুদহার ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকঋণের তুলনায় অনেক কম খরচে তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যবসার মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবেন।

বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংকঋণের বড় বাধা হলো উচ্চ সুদহার ও জামানতের প্রয়োজনীয়তা। নতুন উদ্যোগে এসব বাধা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জমি বা অন্য কোনো সম্পদ বন্ধক না রেখেই যোগ্য তরুণদের ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে—শুধু ঋণ নয়, সফল উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো উদ্যোক্তা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলে এবং তাঁর ব্যবসা ভালো পারফরম্যান্স করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে অনুদান দিতে পারে। একজন উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা ঋণ নিলে যোগ্যতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে আরও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ, নতুন এই ব্যবস্থায় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ‘ঋণ ও পুরস্কার’ ভিত্তিক মডেল তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করলে শুধু ঋণের বোঝা কমবে না, ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অনুদান পাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। এর মাধ্যমে দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের প্রবণতা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা বাছাই

তহবিলের সুবিধা যেন শুধু বড় শহর বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৫০০টির বেশি উপজেলায় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা চিহ্নিত ও যাচাই করবে। স্থানীয় ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক বা নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হতে পারে।

উদ্যোক্তা নির্বাচনে তদবির বা রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের পরিবর্তে ব্যবসার সম্ভাবনা, উদ্যোক্তার দক্ষতা, বাস্তব উদ্যোগ এবং ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা যাতে সহজে অর্থায়নের সুযোগ পান, সেটিই হবে এই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

যেসব ব্যবসা আসতে পারে

প্রস্তাবিত তহবিলের আওতায় শুধু নির্দিষ্ট কোনো খাতকে নয়, উৎপাদন ও বাণিজ্য—দুই ধরনের উদ্যোগকেই বিবেচনায় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে থাকতে পারে—
    •    মৎস্য চাষ ও মৎস্যভিত্তিক ব্যবসা
    •    প্রাণিসম্পদ ও খামার
    •    খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
    •    হস্তশিল্প
    •    শতরঞ্জি ও কারুশিল্প
    •    ক্ষুদ্র উৎপাদনমুখী শিল্প
    •    স্থানীয় পণ্যভিত্তিক ব্যবসা
    •    অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের অর্থায়ন সহজলভ্য হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি তরুণদের চাকরির পেছনে ছোটা কমিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেও তাঁদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারেন না। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, জামানতের শর্ত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল বাস্তবায়িত হলে তা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রাথমিক লক্ষ্য অনুযায়ী অন্তত ৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হলে প্রত্যক্ষভাবে তাঁদের ব্যবসা গড়ে উঠবে। এর পাশাপাশি এসব ব্যবসায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও স্থানীয় শিল্পের মতো খাতে অর্থায়ন বাড়লে উপজেলা পর্যায়ের অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে উদ্যোগটির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে স্বচ্ছ উদ্যোক্তা নির্বাচন, ঋণের যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত তদারকি এবং অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যোগ্যতা নির্ধারণের ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলো যদি প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দিতে পারে এবং ঋণ পরিশোধের সঙ্গে অনুদানের সুযোগকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এই উদ্যোগ দেশের তরুণদের জন্য শুধু ঋণের ব্যবস্থা নয়, বরং নতুন ব্যবসা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

অর্থ ও বাণিজ্য সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ