প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম
বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল গ্রীষ্মের একটি মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি ধীরে ধীরে জাতীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং নগরজীবনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ২০২৪ সালে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দেশের অর্থনীতিতে ১.৩ থেকে ১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি এবং জিডিপির ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ হারিয়ে যাওয়ার হিসাব উদ্বেগজনক।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। প্রতি বছর কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ হারিয়ে যাওয়া এবং তা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমতুল্য উৎপাদনশীলতার ক্ষতি—এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাতও তাপজনিত চাপের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর অর্থ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা আমাদের জন্য সময়োপযোগী। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শুধু শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে না, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কর্মক্ষেত্রে সামাজিক সমস্যাও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও সহনশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, শিল্পমালিক এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা, বিশ্রামের সময় নিশ্চিত করা এবং তাপপ্রবাহের সময় কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাসের মতো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে নগরায়ণে সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ এবং তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এড়ানোর সুযোগ আর নেই। এখন প্রয়োজন ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি এবং অভিযোজনের সক্ষমতা বৃদ্ধি। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন তার শ্রমশক্তি সুস্থ, নিরাপদ এবং উৎপাদনশীল থাকে। তাপপ্রবাহকে তাই শুধু পরিবেশগত সংকট হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
আজকের সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগই আগামী দিনের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে দেবে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—তাপপ্রবাহের সঙ্গে লড়াইয়ে আমরা প্রস্তুতি নেব, নাকি ক্ষতির হিসাবই শুধু বাড়তে দেখব।