প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
২০২৪ সালে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে ১.৩ থেকে ১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা শুধু কর্মঘণ্টাই কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা দ্রুত কমে যায়। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে কাজ করার ফলে কর্মীদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পায়, কাজের গতি কমে যায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা খাতসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে প্রতি বছর ঢাকায় মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরি হারানোর সমতুল্য। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার ক্ষতি ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা নগর অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতও জলবায়ুজনিত এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক শিল্পে তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহের কারণে পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকরা অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। প্রচণ্ড গরমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ায় কর্মক্ষেত্রে চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনাও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর চরম তাপপ্রবাহের কারণে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জট বলেন, “তাপসহনশীল নগর গড়ে তোলা শুধু মানুষের জীবন রক্ষার বিষয় নয়, এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের জন্য আরও সহনশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে তাপ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা, শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এসব পদক্ষেপ এখন শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।