প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
গভীর রাতে হঠাৎ মনে হলো যেন উঁচু কোনো জায়গা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো শরীর কেঁপে উঠল, বুক ধড়ফড় করতে লাগল, ঘুম ভেঙে গেল। অনেকেই এটিকে দুঃস্বপ্ন ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাটির একটি নির্দিষ্ট নাম রয়েছে—হিপনিক জার্ক (Hypnic Jerk) বা স্লিপ স্টার্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। তবে বারবার ঘটলে কিংবা এর সঙ্গে অন্য কিছু লক্ষণ যুক্ত হলে তা স্নায়বিক রোগের সতর্কবার্তাও হতে পারে।

আসলে কী ঘটে?
জেগে থাকা অবস্থা থেকে যখন শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের প্রথম ধাপে প্রবেশ করে, তখন মস্তিষ্ক ও পেশির কার্যক্রমে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। এ সময় হঠাৎ কোনো পেশি অনিচ্ছাকৃতভাবে সংকুচিত হলে শরীরে ঝাঁকুনি লাগে। একই সঙ্গে মস্তিষ্ক মুহূর্তের জন্য এমন অনুভূতি তৈরি করতে পারে যেন শরীর নিচে পড়ে যাচ্ছে।
এ কারণেই অনেকে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হাত-পা ছুড়ে দেন বা চমকে উঠে বসে পড়েন।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৭ জন জীবনের কোনো না কোনো সময় এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
কেন হয় এই অনুভূতি?
হিপনিক জার্কের নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নেই। তবে কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়—
• অতিরিক্ত শারীরিক ক্লান্তি
• দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি
• মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
• অতিরিক্ত চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংক পান
• ধূমপান বা নিকোটিন গ্রহণ
• অনিয়মিত জীবনযাপন
• রাত জেগে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, শরীর ঘুমাতে চাইলেও যদি মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিশ্রামের অবস্থায় যেতে না পারে, তখন এই ধরনের ঝাঁকুনির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
স্বপ্ন, নাকি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া?
হিপনিক জার্কের সময় অনেকেই দেখেন—
• উঁচু ভবন থেকে পড়ে যাচ্ছেন,
• হোঁচট খেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছেন,
• বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো অনুভূতি,
• অথবা হঠাৎ কেউ ধাক্কা দিয়েছে।
এগুলো প্রকৃতপক্ষে স্বপ্ন নয়; বরং ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের তৈরি হওয়া সংবেদন।
কখন এটি বিপদের সংকেত?
সব ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
• প্রতিদিন বা খুব ঘন ঘন ঝাঁকুনি হওয়া
• ঘুমের মধ্যে খিঁচুনি
• মুখ থেকে ফেনা বের হওয়া
• জিহ্বা কামড়ে যাওয়া
• ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব হয়ে যাওয়া
• দীর্ঘ সময় শরীর শক্ত হয়ে থাকা
• ঝাঁকুনির পর দীর্ঘক্ষণ অচেতন থাকা
এ ধরনের লক্ষণ মৃগীরোগ, স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগ কিংবা অন্য কোনো নিউরোলজিক্যাল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

ঝুঁকি কমানোর উপায়
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ অভ্যাস মেনে চলার পরামর্শ দেন—
• প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া
• অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা
• রাতে কফি, চা ও এনার্জি ড্রিংক এড়ানো
• ঘুমানোর আগে মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার কমানো
• নিয়মিত ব্যায়াম করা, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে নয়
• মানসিক চাপ কমাতে মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা
ভয়ের কিছু আছে?
চিকিৎসকদের মতে, এক-দুইবার হিপনিক জার্ক হওয়া সাধারণত কোনো রোগের লক্ষণ নয়। এটি শরীরের স্বাভাবিক স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার অংশ। তবে যদি এটি ঘন ঘন হয়, ঘুমের মান নষ্ট করে বা এর সঙ্গে খিঁচুনি ও অন্যান্য অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারণ খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ পড়ে যাওয়ার অনুভূতি যতই ভয়ঙ্কর মনে হোক না কেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ক্ষতিকর নয়। তবে শরীর যখন বারবার একই সংকেত দিতে থাকে, তখন সেটিকে অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ভালো ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, সুস্থ মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।