প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
বিমান পরিবহন শিল্পে একটি প্রশ্ন সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে—একই মালিক বা একই হোল্ডিং কোম্পানির অধীনে একাধিক এয়ারলাইন্স পরিচালনা করা কতটা যৌক্তিক? কক্সবাজারে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও Air Astra এর কর্ণধার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনকে করা একটি প্রশ্ন থেকেই বিষয়টি সামনে এসেছে।
তবে বিশ্বের এভিয়েশন শিল্পের বাস্তবতা বলছে, একই মালিকানার অধীনে একাধিক এয়ারলাইন্স পরিচালনা কোনো নতুন বা ব্যতিক্রমী বিষয় নয়। বরং এটি বিশ্বের বড় বড় এভিয়েশন গ্রুপগুলোর একটি পরীক্ষিত, স্বীকৃত এবং সফল ব্যবসায়িক মডেল।


আধুনিক বিমান ব্যবসায় এখন শুধু একটি এয়ারলাইন্স পরিচালনা করে পুরো বাজার দখলের চেষ্টা করা হয় না। বরং বড় এভিয়েশন গ্রুপগুলো যাত্রীদের চাহিদা, আয়ের স্তর, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং রুটের ধরন অনুযায়ী একাধিক ব্র্যান্ড তৈরি করে। একটি ব্র্যান্ড থাকে প্রিমিয়াম যাত্রীদের জন্য, অন্যটি থাকে কম খরচে ভ্রমণ করতে চাওয়া যাত্রীদের জন্য। এর মাধ্যমে একই মালিকানার অধীনে থেকেও বিভিন্ন বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়।

বিশ্বের অন্যতম সফল উদাহরণ হলো Singapore Airlines Group। একই গ্রুপের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক সেবার Singapore Airlines এবং স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন্স Scoot। Singapore Airlines যেখানে দীর্ঘ দূরত্বের রুট, উন্নত সেবা এবং ব্যবসায়িক যাত্রীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়, সেখানে Scoot মূলত কম খরচে ভ্রমণ করতে চাওয়া পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য তৈরি। একই মালিকানা হলেও দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা।

ইউরোপের Lufthansa Group একই মডেলের অন্যতম বড় উদাহরণ। এই গ্রুপের অধীনে রয়েছে Lufthansa, SWISS, Austrian Airlines, Brussels Airlines, Eurowings, Discover Airlines এবং Air Dolomiti। Lufthansa, SWISS ও Austrian Airlines পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সেবার বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে Eurowings ইউরোপের স্বল্প দূরত্বের ও কম খরচের বাজারে কাজ করছে। একই গ্রুপ ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহক শ্রেণিকে লক্ষ্য করে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

অস্ট্রেলিয়ার Qantas Group-ও একই কৌশল অনুসরণ করছে। তাদের অধীনে রয়েছে Qantas এবং Jetstar। Qantas প্রিমিয়াম যাত্রীদের জন্য, আর Jetstar কম খরচের যাত্রীদের জন্য। ফলে একই গ্রুপ একই সঙ্গে দুই ধরনের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে।
ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো Tata Group। ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটা বিমান খাতে একই মালিকানার অধীনে একাধিক ব্র্যান্ড পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। Air India অধিগ্রহণের পর Tata Group-এর এভিয়েশন ব্যবসায় Air India, Air India Express এবং যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে পরিচালিত Vistara—তিনটি ভিন্ন ব্র্যান্ড ছিল।

Air India ছিল পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সেবার বাহক, Air India Express ছিল মূলত লো-কস্ট মডেলের এয়ারলাইন্স, আর Vistara তৈরি হয়েছিল প্রিমিয়াম ফুল-সার্ভিস ক্যারিয়ার হিসেবে। Vistara ভারতের বাজারে উন্নত কেবিন সেবা, করপোরেট যাত্রী এবং প্রিমিয়াম ভ্রমণকারীদের লক্ষ্য করে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে Tata Group Air India ও Vistara-কে একীভূত করে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন গ্রুপ গঠনের পথে এগিয়ে যায়।
এই উদাহরণটি দেখায়, একই মালিকানার অধীনে একাধিক এয়ারলাইন্স পরিচালনা মানেই সব সময় একাধিক ব্র্যান্ড ধরে রাখা নয়। বাজার পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় গ্রুপগুলো কখনো নতুন ব্র্যান্ড তৈরি করে, আবার কখনো একীভূত করে।
ইউরোপের আরেক শক্তিশালী এভিয়েশন গ্রুপ International Airlines Group (IAG)-এর অধীনে রয়েছে British Airways, Iberia, Aer Lingus, Vueling এবং LEVEL। British Airways যেখানে প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী, সেখানে Vueling ও LEVEL কম খরচের ভ্রমণকারীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে।

এশিয়ায় AirAsia Group আরেকটি সফল উদাহরণ। AirAsia Malaysia, Thai AirAsia, Indonesia AirAsia এবং Philippines AirAsia—বিভিন্ন দেশের বাজারে একই ব্যবসায়িক দর্শন নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আলাদা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তারা দ্রুত সম্প্রসারণ করেছে।
জাপানের ANA Holdings-এর অধীনে রয়েছে All Nippon Airways (ANA), Peach Aviation এবং AirJapan। জাপানের বাজারে পূর্ণাঙ্গ সেবা ও কম খরচের সেবা—দুই ধরনের যাত্রীকে লক্ষ্য করে এই মডেল পরিচালিত হচ্ছে। একইভাবে মালয়েশিয়া এভিয়েশন গ্রুপের অধীনে রয়েছে Malaysia Airlines, Firefly, MASwings এবং Amal।

বিশ্বের বড় এয়ারলাইন গ্রুপগুলো কেন একই মালিকানায় একাধিক এয়ারলাইন্স পরিচালনা করে? এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক যুক্তি। প্রথমত, বাজারকে ভাগ করা যায়। একটি এয়ারলাইন্স দিয়ে সব ধরনের যাত্রীকে সমানভাবে সেবা দেওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, লো-কস্ট ও ফুল-সার্ভিস মডেল আলাদা হওয়ায় পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। তৃতীয়ত, একটি বাজারে সংকট তৈরি হলে অন্য ব্র্যান্ড থেকে আয় ধরে রাখা সম্ভব হয়। চতুর্থত, নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।
বিমান ব্যবসা এখন শুধু উড়োজাহাজ কেনা বা রুট পরিচালনার বিষয় নয়; এটি একটি কৌশলগত বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়। কোন যাত্রী কোন ধরনের সেবা চান, কোন রুটে কোন ব্যবসায়িক মডেল কার্যকর হবে—এসব বিবেচনা করেই বিশ্বের বড় এভিয়েশন গ্রুপগুলো তাদের ব্র্যান্ড তৈরি করে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতও বর্তমানে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যাত্রী সংখ্যা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বের সফল এয়ারলাইন্স গ্রুপগুলোর মডেল বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।

একই মালিকানার অধীনে একাধিক এয়ারলাইন্স পরিচালনা মানেই একটি প্রতিষ্ঠান আরেকটির প্রতিদ্বন্দ্বী হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক পূর্ণাঙ্গ সেবার জন্য এবং অন্যটি আঞ্চলিক, পর্যটন বা কম খরচের বাজারের জন্য ব্যবহার করা যায়।
অবশ্যই যেকোনো নতুন এয়ারলাইন্স পরিচালনার ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, আর্থিক সক্ষমতা, নিরাপত্তা মান, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক বিধিমালা পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, একই মালিকানায় একাধিক এয়ারলাইন্স পরিচালনা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং এটি আধুনিক এভিয়েশন শিল্পের একটি স্বীকৃত ও সফল ব্যবসায়িক কৌশল। সিঙ্গাপুর থেকে জার্মানি, ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া—বিশ্বের বড় বড় এভিয়েশন গ্রুপ এই মডেল ব্যবহার করে নিজেদের বাজার শক্তিশালী করেছে।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—একই মালিকানায় একাধিক এয়ারলাইন্স কেন?
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে আন্তর্জাতিক মান, সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ব্যবসায়িক মডেলকে সফল করা যায়।