প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
একটি যাত্রীবাহী জ্যাম্বো জেট বিমান যদি হঠাৎ রাডার থেকে হারিয়ে যায়, পুরো বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দিন-রাত সেই খবর প্রচারিত হয়, উদ্ধার অভিযান চালানো হয়, রাষ্ট্রগুলো একযোগে অনুসন্ধানে নামে। অথচ আনুমানিক ৫৩০ জন রোহিঙ্গাকে বহনকারী দুটি নৌকা বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তেমন কোনো আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি। যেন এরা মানুষ নয়, পরিসংখ্যান মাত্র।
এটাই আজকের বিশ্বের নির্মম বাস্তবতা। রোহিঙ্গাদের জীবন যেন আন্তর্জাতিক বিবেকের কাছে ক্রমেই কম মূল্যবান হয়ে উঠছে।

বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, গত ২৯ জুন রাখাইনের সিন তেত মাও এলাকা থেকে দুটি নৌকা যাত্রা করেছিল। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই। সমুদ্রে ভেসে পাওয়া কয়েকটি মরদেহ, বাংলাদেশের উপকূলে উদ্ধার হওয়া এক নারীর লাশ এবং বিচ্ছিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে—দুটি নৌকাই ডুবে গেছে। যদি তা-ই সত্যি হয়, তবে এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় নৌ-মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি।
কিন্তু এই মৃত্যু কেবল সমুদ্রের নয়। এটি বহু বছরের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, আঞ্চলিক নিষ্ক্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার সম্মিলিত পরিণতি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের জন্য টেকসই কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসেনি। বাংলাদেশ আজও ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে, কিন্তু এই দায়িত্বের ভার বহন করার সক্ষমতা ও সামর্থ্য কোনো দেশেরই অসীম নয়।

কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম, যারা কখনো নিজের দেশ দেখেনি। শিক্ষা সীমিত, কর্মসংস্থান নেই, স্বাধীন চলাচলের সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, খাদ্য রেশন কমছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। একই সময়ে মানবপাচারকারী চক্রগুলো এই হতাশাকে পুঁজি করে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ ব্যবসা গড়ে তুলেছে।
অন্যদিকে রাখাইনে যারা রয়ে গেছে, তাদের অবস্থাও সমান ভয়াবহ। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের মধ্যে আটকে থাকা রোহিঙ্গারা কার্যত রাষ্ট্রহীন, অধিকারহীন এবং নিরাপত্তাহীন। অনেককে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। ফলে তাদের সামনে দুটি পথ—ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অথবা অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রায় জীবন বাজি রাখা।
এই বাস্তবতায় নৌকায় ওঠা কোনো রোমাঞ্চ নয়; এটি বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা।

রোহিঙ্গাদের এই যাত্রা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের নিষ্ঠুর ব্যবসায়ও পরিণত হয়েছে। পরিবারের কাছ থেকে কয়েক হাজার ডলার আদায়, অর্থ না দিলে নির্যাতন, বন্দিত্ব, এমনকি হত্যার হুমকি—সবই এখন এই ব্যবসার অংশ। মানবিক সংকটকে পুঁজি করে অপরাধীরা বিপুল মুনাফা করছে, অথচ তাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর সমন্বিত অভিযান এখনো সীমিত।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এখন রোহিঙ্গাবাহী নৌকা নিজেদের উপকূলে ভিড়তে দিতে চায় না। কেউ তাদের ফিরিয়ে দেয়, কেউ সমুদ্রে ঠেলে দেয়, কেউ সীমান্ত বন্ধ করে রাখে। ফলে সমুদ্র এখন আর শুধু পথ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য গণকবরে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অবস্থানও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একদিকে মানবিক দায়িত্ব, অন্যদিকে নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনীতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকট, যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং যার দায় বহন করা উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

জাতিসংঘ বহুবার নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথ, পুনর্বাসন এবং প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বাস্তব রোডম্যাপ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যখন ভূরাজনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত, তখন শত শত রোহিঙ্গার মৃত্যু আন্তর্জাতিক সংবাদচক্রে খুব দ্রুতই হারিয়ে যায়। অথচ প্রতিটি নিখোঁজ নৌকার সঙ্গে ডুবে যায় অসংখ্য স্বপ্ন, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং মানবাধিকারের প্রতি বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির বিশ্বাস।

৫৩০ জন মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের সময়ের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক। এমন মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন মানুষ নিজের জন্মভূমিতে নিরাপদ থাকে না, আশ্রয়ের দেশ ভবিষ্যৎ দিতে পারে না এবং পৃথিবীর আর কোনো দেশ তাদের গ্রহণ করতে চায় না।
রোহিঙ্গাদের এই নিখোঁজ নৌকা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবিক সংকট কখনো সমুদ্রে শুরু হয় না; তার সূচনা হয় রাজনীতি, বৈষম্য, যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক নীরবতার ভেতর। আর সেই নীরবতা ভাঙতে না পারলে, আজকের ৫৩০ জনের জায়গায় আগামীকাল হয়তো আরও শত শত মানুষ একইভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবে—কোনো নাম ছাড়া, কোনো শোকসভা ছাড়া, কোনো জবাবদিহি ছাড়াই।