প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। একদিকে তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও বায়ুদূষণ—সব মিলিয়ে পরিবেশ আজ এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু ইতিহাস বলে, বড় ঘোষণা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবায়ন।
দেশে বৃক্ষরোপণ নতুন কোনো কর্মসূচি নয়। বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি চারা রোপণের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু আজও শহর হারাচ্ছে তার সবুজ, গ্রাম হারাচ্ছে ফলদ ও বনজ গাছ, আর উন্মুক্ত স্থান দখল হচ্ছে কংক্রিটের স্থাপনায়। প্রশ্ন হলো—আগের উদ্যোগগুলোর কত শতাংশ গাছ আজও জীবিত? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর ছাড়া নতুন লক্ষ্য অর্জনের আশাবাদ পূর্ণতা পায় না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না; সেগুলোর যত্নও নিতে হবে। এই একটি বাক্যই পুরো কর্মসূচির সফলতার মূল দর্শন। কারণ একটি চারা রোপণ করতে কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত করতে লাগে বছরের পর বছর দায়িত্ব, পরিকল্পনা ও পরিচর্যা।
এই কর্মসূচিকে রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী প্রজাতি নির্বাচন, জলাশয় ও খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সমন্বিত সবুজায়ন, এবং প্রতিটি রোপিত চারার ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে বনভূমি দখল, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং নগর পরিকল্পনায় সবুজ এলাকা সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একদিকে গাছ লাগিয়ে অন্যদিকে পুরোনো গাছ কেটে ফেললে পরিবেশের প্রকৃত লাভ হবে না।

সবুজ বাংলাদেশ কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় দায়বদ্ধতা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কৃষক, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে এই উদ্যোগের অংশীদার হতে হবে। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না; এটি ছায়া দেয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, মাটি সংরক্ষণ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলে।
২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা তাই কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি সরকারের সক্ষমতা, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং জাতির পরিবেশ-সচেতনতার একটি বড় পরীক্ষা। এই কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য উদযাপিত হবে সেদিন, যেদিন রোপণ করা চারাগুলো দেশের প্রতিটি জনপদে ছায়াঘেরা বৃক্ষে পরিণত হবে, আর বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই আরও সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।