• ঢাকা সোমবার
    ২৯ জুন, ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

উজানের ঢল, ভাটির কান্না—আবারও বন্যার আশঙ্কা

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম

উজানের ঢল, ভাটির কান্না—আবারও বন্যার আশঙ্কা

সৈয়দ আতিক

বর্ষা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদও, আবার দুর্যোগেরও অন্য নাম। প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, তিস্তা, সুরমা, কুশিয়ারা ও যাদুকাটাসহ বেশ কয়েকটি নদী সতর্কসীমায় রয়েছে। আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে দেশের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি বা বিদ্যমান পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পূর্বাভাসকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সময়মতো প্রস্তুতি না নিলে স্বল্পমেয়াদি বন্যাও মানুষের জীবন, কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নদীভাঙনপ্রবণ ও চরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। তাদের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু এবং জীবিকা একসঙ্গে হুমকির মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের বন্যার একটি বড় কারণ উজানের পানি। ভারতের আসাম, অরুণাচল, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে অতিভারি বৃষ্টিপাত হলে তার প্রভাব খুব দ্রুত বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোতে পড়ে। ফলে অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির সঙ্গে উজানের ঢল মিলিত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এ বাস্তবতা মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে নদীর তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হওয়া জরুরি।

এবারের পূর্বাভাসে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পাশাপাশি তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, জামালপুর, বগুড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের নিম্নাঞ্চলের মানুষকে তাই বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

প্রস্তুতি মানে শুধু ত্রাণ মজুত নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা, গবাদিপশু রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। কখনো দীর্ঘ খরা, কখনো আকস্মিক বন্যা—এ দুইয়ের মধ্যেই দেশের মানুষকে বাঁচতে হচ্ছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক দুর্যোগ মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। গুজবে কান না দিয়ে সরকারি সতর্কবার্তা অনুসরণ করা, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলাই হতে পারে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া যায় না, তবে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই বন্যা যখন এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে, তখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের জন্য এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান।


 

মতামত সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ