• ঢাকা বৃহস্পতিবার
    ২৫ জুন, ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো এখনও সম্ভব

প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো এখনও সম্ভব

সৈয়দ আতিক

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি ভোট কেবল একটি আইনগত পদক্ষেপ নয়; বরং একটি জাতির বিবেকের প্রকাশ হয়ে ওঠে। মার্কিন কংগ্রেসের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তেমনই একটি ঘটনা। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান সীমিত করতে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক যুদ্ধক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদের পর এবার সিনেটেও পাস হয়েছে। এই ভোট কেবল রাজনৈতিক নয়, গণতন্ত্র, সংবিধান এবং শান্তির পক্ষে একটি দৃঢ় অবস্থান।

মার্কিন সিনেটে প্রস্তাবটি ৫০-৪৮ ভোটে গৃহীত হয়েছে। চারজন রিপাবলিকান সিনেটর নিজ দলের প্রেসিডেন্টের অবস্থানের বিপক্ষে গিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। এটি বিরল রাজনৈতিক সাহসিকতার উদাহরণ এবং একই সঙ্গে প্রমাণ করে যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ানো এখনও সম্ভব।  

কংগ্রেসের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার জন্যই কংগ্রেসকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণা, সামরিক ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ সেই সাংবিধানিক দায়িত্বই পালন করেছে।  

ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে যুদ্ধের শুরু যত সহজ, তার সমাপ্তি তত জটিল। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক এবং লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে সরকার বদলানো যায়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ—শিশু, নারী, বৃদ্ধ এবং নিরীহ নাগরিকরা। হাজার হাজার প্রাণহানি, উদ্বাস্তু সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং প্রজন্মব্যাপী মানসিক ক্ষত যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপও দেখাচ্ছে, অধিকাংশ আমেরিকান নাগরিক নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বিস্তারের পক্ষে নন। জনগণের এই উদ্বেগ কংগ্রেসের ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বুঝেছেন, জনগণ বোমা নয়, কূটনীতি চায়; সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতা চায়।  

ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়। এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা এবং নতুন মানবিক সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলতে পারে। তাই যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আজ মার্কিন কংগ্রেস যে বার্তা দিয়েছে, তা শুধু ওয়াশিংটনের জন্য নয়; সমগ্র বিশ্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। গণতন্ত্রের শক্তি অস্ত্রের শক্তির চেয়ে বড়। জনগণের প্রতিনিধি যখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তারা আসলে মানবতার পক্ষেই অবস্থান নেন।

সেজন্য মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো প্রয়োজন। তারা প্রমাণ করেছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শান্তি, সংবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও তারা শান্তির পক্ষে একটি সাহসী কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন।

বিশ্ব আজ নতুন কোনো যুদ্ধ চায় না। বিশ্ব চায় আলোচনার টেবিল, কূটনৈতিক সমাধান এবং পারস্পরিক সম্মান। কংগ্রেসের এই অবস্থান সেই প্রত্যাশাকেই নতুন করে শক্তি জুগিয়েছে। ইতিহাস হয়তো একদিন এই ভোটকে স্মরণ করবে—যে দিন রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর গণতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের ওপর শান্তির আহ্বান বিজয়ী হয়েছিল।


 

মতামত সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ