প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে কেবল একটি উৎসব নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর প্রতীক। আজ বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বাঙালিরা যে আনন্দ-উৎসাহে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করছে, তার পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য ও বাস্তবতার গল্প।
ইতিহাসের আলোকে জানা যায়, বাংলা সনের প্রবর্তন ঘটে সম্রাট আকবর-এর শাসনামলে। কৃষিনির্ভর বাংলায় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের পরিবর্তে সৌরভিত্তিক পঞ্জিকা চালু করা হয়, যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দরবারের জ্যোতির্বিদ ফতেহুল্লাহ সিরাজী-এর। সেই সময় পহেলা বৈশাখ ছিল মূলত অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সূচনাদিবস—খাজনা আদায়, হিসাব-নিকাশ ও “হালখাতা”র দিন।
কালের পরিক্রমায় এই দিনটি অর্থনৈতিক সীমা পেরিয়ে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পহেলা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে নতুন তাৎপর্য লাভ করে। ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা সেই চেতনারই বহিঃপ্রকাশ—যেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে অংশ নেয়।
একই সঙ্গে, ভারত-এর পশ্চিমবঙ্গে “পয়লা বৈশাখ” ভিন্ন রীতিতে উদযাপিত হলেও মূল চেতনা একই—নতুন সূচনা, সামাজিক বন্ধন এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। আর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা এই উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখছেন।
তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আধুনিক সময়ে পহেলা বৈশাখ ক্রমেই বাণিজ্যিকীকরণের চাপে পড়ছে। উৎসবের মূল দর্শন—সরলতা, মানবিকতা ও সাম্যের বার্তা—কখনো কখনো আড়ম্বর আর প্রদর্শনীর আড়ালে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি এই উৎসবের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ যথাযথভাবে ধারণ করতে পারছি?
পহেলা বৈশাখের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিতে—ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতায়। এই শক্তিকেই লালন করা জরুরি। উৎসব যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজে সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও নতুন করে শুরু করার সাহস জাগিয়ে তোলে—সেই প্রত্যাশাই থাকা উচিত।
নতুন বছরের প্রারম্ভে পহেলা বৈশাখ আমাদের সামনে যে বার্তা তুলে ধরে, তা স্পষ্ট—অতীতের শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে সুসংহত করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়া। এই চেতনাই হোক আমাদের পথচলার দিশা।