• ঢাকা সোমবার
    ০৮ জুন, ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর ঢাকা

বাংলাদেশ কতটা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে? বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম

বাংলাদেশ কতটা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে? বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় আবারও সামনে এসেছে বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প-সংবেদনশীল অঞ্চলে অবস্থিত। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। 

সাম্প্রতিক একাধিক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের বাইরে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিব্বত ও মিয়ানমারে উৎপন্ন ভূমিকম্প বাংলাদেশে অনুভূত হয়। যদিও এসব ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল শত শত কিলোমিটার দূরে, তবুও দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন।

তিন টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ 

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। এই প্লেটগুলোর পারস্পরিক চাপ ও সংঘর্ষের কারণে ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হয়। একপর্যায়ে সেই শক্তি ফল্ট লাইনের মাধ্যমে মুক্ত হয়ে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভেতরে ও আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। এর মধ্যে ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, আসাম-শিলং ফল্ট জোন এবং মিয়ানমার উপকূলসংলগ্ন আরাকান সাবডাকশন জোন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা কতটা?

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের আশপাশের ফল্টগুলোতে অতীতে ৭ থেকে ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প এবং ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এ অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতেও এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে মিয়ানমারের আরাকান সাবডাকশন জোনকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ঢাকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর হলো ঢাকা। কারণ রাজধানীতে বিপুল জনসংখ্যার পাশাপাশি রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন, সরু সড়ক এবং বহু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন।অনেক ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে মাঝারি থেকে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার আশপাশে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটলে হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়তে পারেন।

কোন অঞ্চলগুলো বেশি ঝুঁকিতে?ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক থেকে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয় ।এছাড়া ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রস্তুতিতে ঘাটতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রস্তুতির অভাব। অনেক পুরনো ভবনের ঝুঁকি মূল্যায়ন হয়নি, পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম নেই এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভূমিকম্প-পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা সীমিত। তাদের মতে, ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত মহড়া, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ভূমিকম্প গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ জাপানের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ না হলেও এটিকে ‘মধ্যম থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ অঞ্চলের মধ্যে ধরা হয়। তাই বড় ধরনের ভূমিকম্প কবে হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও সম্ভাব্য দুর্যোগের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

তাদের ভাষায়, “ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”


 

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ