• ঢাকা রবিবার
    ০৭ জুন, ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
তিন দিন ধরে কাঁদছে শিশুদের চোখ

দেশহীন অপেক্ষা, সীমান্তের আইলে মানবতার দীর্ঘশ্বাস

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম

দেশহীন অপেক্ষা, সীমান্তের আইলে মানবতার দীর্ঘশ্বাস

শূন্যরেখায় আটকে আছে মানবতা: প্রখর রোদ, কাদাপানি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে নারী-শিশুদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

দেশজুড়ে ডেস্ক

জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুর। মাথার ওপরে আগুনঝরা সূর্য, চারদিকে ধু-ধু ফসলি মাঠ। ধানের খেতে জমে থাকা পানির মাঝখানে সরু একটি আইল—সেখানেই তিন দিন ধরে আশ্রয় নিয়েছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। কারও হাতে একটি পলিথিন, কেউ আবার শিশুদের কোলে নিয়ে বসে আছেন। না আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, না আছে নিশ্চিত খাবার কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে যেন সময় থমকে গেছে। 

একদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ, অন্যদিকে বাংলাদেশের বিজিবি। দুই বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মাঝখানে মানবিক সংকটের মুখোমুখি কয়েকটি পরিবার। সীমান্তের নীরবতা ভেঙে মাঝে মাঝে ভেসে আসে শিশুদের কান্না, উদ্বিগ্ন স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আর স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ।

পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১০ জন এবং ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্তে আরও ১১ জন মানুষ তিন দিন ও প্রায় দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। দুই দেশের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও তাদের ভাগ্যের কোনো সুরাহা হয়নি। 

ছবিতে দেখা যায়, কাদাপানিতে ঘেরা জমির আইলে গাদাগাদি করে বসে আছেন নারী-শিশুরা। প্রচণ্ড রোদ থেকে বাঁচতে মাথার ওপরে টানানো হয়েছে ছোট্ট একটি পলিথিন। চারপাশে পানি জমে থাকায় নড়াচড়া করাও কঠিন। দিনের তীব্র গরম আর রাতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

স্থানীয়রা বলছেন, এমন দৃশ্য সীমান্ত এলাকায় খুব কমই দেখা গেছে। মানবিক কারণে গ্রামের মানুষ খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্তে অবস্থানরত ১১ জনের মধ্যে রয়েছেন চার শিশু, চার নারী ও তিন পুরুষ। তাদের একজন অন্তঃসত্ত্বা এবং একজন শিশু প্রতিবন্ধী। প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে তাদের।

সীমান্তের দৃশ্য এখন শুধু একটি প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি হয়ে উঠেছে মানবতার এক কঠিন পরীক্ষা। দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের মুখের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্রের সীমারেখা কি কখনও মানবিকতার চেয়ে বড় হতে পারে। 

বিজিবি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ না করে কোনো ধরনের পুশ-ইন গ্রহণ করা হবে না। যথাযথ প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের হস্তান্তর করা হলে তা বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে বিএসএফের সঙ্গে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি।

সীমান্তের কাদামাখা সেই সরু আইলে বসে থাকা মানুষগুলোর জন্য প্রতিটি ঘণ্টা যেন আরও দীর্ঘ হয়ে উঠছে। সূর্য ডুবে যাবে, রাত নামবে, আবার ভোর হবে—কিন্তু তাদের অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়, সেই উত্তর এখনো অজানা।

বিজিবির নীলফামারী ৫৬ ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সিরাজুল ইসলাম ১০ জন ভারতীয় নাগরিককে পুশ-ইনের ঘটনাকে অত্যন্ত অমানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যেহেতু তারা ভারত থেকে এসেছে এবং বর্তমানে ভারতীয় শূন্যরেখায় অবস্থান করছে; তাই তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বা গ্রহণও করা হবে না। যদি কোনো নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে থেকে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে ইমিগ্রেশন আইনে পুলিশের মাধ্যমে তাদের হস্তান্তর করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বিএসএফ অবৈধভাবে পুশ-ইন করা হলে তা বিজিবি মেনে নেবে না। 

অপরদিকে, দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন হাসান বলেন, বিজিবির পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে অবৈধ পুশ-ইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী যথাযথ প্রমাণসহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হস্তান্তর করা হলে আমরা গ্রহণ করব। তবে কোনো ধরনের অবৈধ পুশ-ইন গ্রহণ করা হবে না বলে জানান তিনি। 

খবর পঞ্চগড়ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধির 

 

আর্কাইভ