• ঢাকা বুধবার
    ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

একটি গাছ, একটি ভবিষ্যৎ: প্রাথমিক শিক্ষায় পরিবেশচেতনার বীজ বপন

প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

একটি গাছ, একটি ভবিষ্যৎ: প্রাথমিক শিক্ষায় পরিবেশচেতনার বীজ বপন

সৈয়দ আতিক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বান—দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে—এটি নিছক একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ-দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয়। পরিবেশ রক্ষার লড়াই কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়। সেই দায়বোধ শৈশব থেকেই গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে আরও সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এখন বাস্তবতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৃক্ষই সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশের ভিত্তি নির্মাণ।

গাছ লাগানো যেমন সহজ, তেমনি সেই গাছকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে বহু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আয়োজন হলেও পরিচর্যার অভাবে অসংখ্য চারা নষ্ট হয়েছে। তাই শুধু একটি গাছ লাগানোর আহ্বান নয়, প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই গাছের প্রতি দায়িত্ববোধও তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়ে যদি প্রতিটি গাছের জন্য একজন শিক্ষার্থীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, নিয়মিত পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে এই কর্মসূচি বাস্তব সাফল্য পাবে। একটি শিশুর হাতে একটি গাছ তুলে দেওয়া মানে তার হাতে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং নাগরিক সচেতনতার একটি জীবন্ত প্রতীক তুলে দেওয়া।

‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক, বিষয়ভিত্তিক কুইজ, কাবিং ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ২ কোটি ১৮ লাখ ২৮ হাজার ৬৯৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। এছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে ১৫টি ক্যাটাগরিতে ১২ হাজার ৩৮৪ জন এবং প্রতিষ্ঠানপর্যায়ে ২টি ক্যাটাগরিতে ৬৫ হাজার ৫৪৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠদের সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, প্রাথমিক শিক্ষা এখন কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে।

তবে শুধু পুরস্কার প্রদান বা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধনের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলে চলবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিদ্যালয়ভিত্তিক ‘সবুজ ক্যাম্পাস’ কর্মসূচি, গাছের ডিজিটাল নিবন্ধন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নিয়মিত পরিচর্যা, স্থানীয় সরকার, বন বিভাগ ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং নির্দিষ্ট সময় পর গাছের বেঁচে থাকার হার মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা জরুরি। লাগানো গাছের সংখ্যা নয়, টিকে থাকা গাছের সংখ্যাই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের পথে পরিবেশ সংরক্ষণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে তারা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে আরও পরিবেশ-সচেতন পথে পরিচালিত করতে পারবে। আজকের একটি ছোট চারা যেমন একদিন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়, তেমনি একটি শিশুর মনে রোপিত পরিবেশচেতনার বীজ একসময় একটি দায়িত্বশীল, সচেতন ও সবুজ বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

আর্কাইভ