প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আজ (বুধবার) শক্তিশালী ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বহুল প্রতীক্ষিত এই লড়াইয়ের আগে মাঠের ফুটবলের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে বিতর্ক। স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয়ের মন্তব্যের জবাবে স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল।
গত সপ্তাহে এক অনুষ্ঠানে মারিয়ানো রাজয় ফ্রান্স জাতীয় দলকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “ফ্রান্স খুব ভালো খেলছে। কিন্তু তাদের দলে কতজন প্রকৃত ফরাসি ফুটবলার আছে? খেলোয়াড়দের গায়ের রং দেখলেই সেটি বোঝা যায়।” তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রীড়াঙ্গন—সবখানেই এটিকে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য হিসেবে দেখা হয়।
এই বিতর্কের জবাব দিতে গিয়ে লামিন ইয়ামাল বলেন, “আমরা আগামীকাল একটি অসাধারণ ম্যাচ খেলতে নামব। এটাই ফুটবল—যে খেলা পৃথিবীর সব মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। এখানে ধর্ম, বর্ণ কিংবা গায়ের রঙের কোনো গুরুত্ব নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফুটবল এবং পারস্পরিক সম্মান।”
মাত্র ১৮ বছর বয়সী ইয়ামালের বক্তব্যে ছিল পরিণত মানসিকতার ছাপ। তিনি আরও বলেন, “ফ্রান্স ও স্পেন—দুই দেশই দেখিয়ে দিয়েছে ফুটবল কীভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একত্র করতে পারে। ফুটবলে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই কে কী বলল, সেটি নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আরেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে খেলতে নামছি। আমাদের মনোযোগ শুধু ম্যাচেই।”
ইয়ামালের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ তিনিও বহুসাংস্কৃতিক পরিবারের সন্তান। তার বাবা মরক্কোর এবং মা গিনির বংশোদ্ভূত। কিন্তু জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং ফুটবল ক্যারিয়ার—সবই স্পেনে। তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানেন, একজন মানুষের পরিচয় তার গায়ের রঙে নয়; তার মূল্যবোধ, যোগ্যতা ও অবদানে।
আধুনিক ফুটবলে বহুজাতিক শিকড়ের খেলোয়াড়দের উপস্থিতি এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা। ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি কিংবা বেলজিয়ামের মতো দেশের জাতীয় দলে বিভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়রা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদের সাফল্যই প্রমাণ করে, ফুটবলে প্রতিভা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে ত্বকের রঙের কোনো সম্পর্ক নেই।
ফিফা দীর্ঘদিন ধরেই বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। মাঠে কিংবা গ্যালারিতে বর্ণবিদ্বেষী আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কারণ, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি সমতা, সহাবস্থান ও মানবিক মূল্যবোধেরও প্রতীক।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে লামিন ইয়ামালের বার্তা শুধু স্পেন বা ফ্রান্সের জন্য নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণিকা—গায়ের রং নয়, একজন ফুটবলারের প্রকৃত পরিচয় তার জার্সির প্রতি দায়বদ্ধতা, তার প্রতিভা এবং মাঠের পারফরম্যান্স। ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি বিভাজন নয়, বরং মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতা।