প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো—আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। দুর্বল রাষ্ট্রের নেতা বা সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, শক্তিধর রাষ্ট্রের নেতাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, কূটনৈতিক দ্বিধা এবং দীর্ঘ নীরবতা। এই দ্বৈত মানদণ্ডই আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এমন বাস্তবতায় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির অবস্থান বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রসঙ্গ তুলে তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক মন্তব্য করেননি; বরং আন্তর্জাতিক আইন, জবাবদিহি এবং মানবতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছেন। তার ভাষায়, যদি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখাতে হয়, তবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত যে-ই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকতে পারে না।

তার বক্তব্য—নেতানিয়াহুর স্থান নিউইয়র্কে নয়, দ্য হেগে—নিশ্চয়ই বিতর্ক তৈরি করেছে। কিন্তু গণতন্ত্রে বিতর্ক সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারই গণতন্ত্রের প্রাণ। ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেললেও সত্য উচ্চারণের সাহসই একজন জননেতার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাতে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, শিশুদের অনাহার, হাসপাতাল, স্কুল ও শরণার্থী শিবিরে হামলার অভিযোগ বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড ও জিম্মি করার ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে। এসব ঘটনার চূড়ান্ত আইনি মূল্যায়ন আদালতের দায়িত্ব। কিন্তু অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক সুবিধার কারণে উপেক্ষা করা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেওয়া মানবতার সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত ও বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়াই স্বাভাবিক। আইনের শাসন তখন আর ন্যায়ের প্রতীক থাকে না; বরং ক্ষমতার প্রতিফলনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

জোহরান মামদানির সবচেয়ে বড় শক্তি তার নৈতিক ধারাবাহিকতা। তিনি হামাসের সন্ত্রাসী হামলারও নিন্দা করেছেন, আবার গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর বিরুদ্ধেও সমান কণ্ঠে কথা বলেছেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই তাকে আলাদা করেছে। তিনি কোনো পক্ষের অন্ধ সমর্থক নন; বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আজকের বিশ্বে এমন নেতৃত্বই বিরল, যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল—উভয়ের জন্য একই মানদণ্ডের দাবি তোলা হয়।
অবশ্য বাস্তবতা হলো, নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের এককভাবে কোনো বিদেশি সরকারপ্রধানকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নেই। যুক্তরাষ্ট্রও আইসিসির সদস্য নয়, ফলে এই প্রশ্নে আইনি ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু মামদানির বক্তব্যের গুরুত্ব তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়; এর শক্তি নিহিত নৈতিক সাহসে। তিনি এমন একটি প্রশ্ন তুলেছেন, যা অনেক প্রভাবশালী নেতা উচ্চারণ করতেও সংকোচ বোধ করেন—আন্তর্জাতিক আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান?
বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতা কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে না; বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার ওপরও নির্ভরশীল। যদি একই অপরাধের জন্য এক দেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আর আরেক দেশের ক্ষেত্রে নীরবতা পালন করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বৈপরীত্য দূর করাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আজ পৃথিবীর প্রয়োজন আরও অনেক জোহরান মামদানি—এমন নেতা, যারা ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের ভাষায় কথা বলবেন; যারা কূটনৈতিক সুবিধার চেয়ে মানবতার পক্ষে দাঁড়াবেন; যারা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ যেখানেই উঠুক না কেন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করবেন। কারণ সভ্যতার প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, ন্যায়বিচারে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা ক্ষমতার সামনে নত না হয়ে সত্য ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখায়।
পৃথিবী আরও অনেক মামদানি চায়—কারণ ন্যায়বিচারের পক্ষে উচ্চারিত সাহসী কণ্ঠই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবতার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।