• ঢাকা মঙ্গলবার
    ২১ জুলাই, ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

মেসির অশ্রু, স্পেনের উল্লাসে রাঙা বিশ্বকাপ

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৪:১১ এএম

মেসির অশ্রু, স্পেনের উল্লাসে রাঙা বিশ্বকাপ

সৈয়দ আতিক

ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মঞ্চ। কোটি মানুষের চোখ একসঙ্গে নিবদ্ধ ছিল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরো জয়ের পর বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন দখলের অপেক্ষায় তরুণ ও দুর্দান্ত ছন্দে থাকা স্পেন।

১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে হাসল স্পেন। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করল লা রোজা। ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই স্পেনের খেলোয়াড়রা আনন্দে ছুটে যান মাঠের মাঝখানে, আর বিপরীত প্রান্তে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন লিওনেল মেসি ও তার সতীর্থরা। একপাশে উল্লাস, অন্যপাশে অশ্রু—বিশ্বকাপ ফাইনালের চিরচেনা সেই আবেগঘন দৃশ্য আবারও ফুটে উঠল।

May be an image of soccer, football and text

শুরু থেকেই স্পেনের আধিপত্য

খেলা শুরু হওয়ার পর থেকেই স্পেন নিজেদের স্বাভাবিক ‘পজেশন ফুটবল’ খেলতে থাকে। রদ্রি ও পেদ্রির নিখুঁত পাসিং, লামিন ইয়ামালের ডান প্রান্তের গতি এবং নিকো উইলিয়ামসের ধারালো আক্রমণে বারবার চাপে পড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণ।

আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই অনেকটা নিচে নেমে রক্ষণ সামলানোর কৌশল নেয়। মেসি, আলভারেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টারকে নিয়ে পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা থাকলেও স্পেনের প্রেসিং তাদের সেই সুযোগ খুব কমই দিয়েছে।

মার্টিনেজের একার লড়াই

প্রথমার্ধে স্পেন অন্তত তিনটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই দুর্দান্ত সেভ করেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।

একবার লামিন ইয়ামালের জোরালো শট, আরেকবার নিকো উইলিয়ামসের কাছ থেকে আসা বল—দুটিই অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন তিনি। আর্জেন্টিনা ম্যাচে টিকে ছিল মূলত তাদের গোলরক্ষকের অসাধারণ নৈপুণ্যের কারণেই।

May be an image of football and soccer

মেসিকে আটকে দিল স্পেন

ফাইনালের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য ছিল লিওনেল মেসিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা।

স্পেনের ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডাররা পালাক্রমে তাকে মার্কিং করেন। ফলে তিনি বল পেলেও দ্রুত ঘিরে ফেলা হয়। তার স্বাভাবিক ড্রিবল, থ্রু পাস কিংবা দূরপাল্লার শট—কোনোটিই কার্যকর হতে পারেনি।

জুলিয়ান আলভারেজও ছিলেন বিচ্ছিন্ন। ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজ মাঝমাঠে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব রাখতে ব্যর্থ হন।

May be an image of soccer, football and cleats

গোলশূন্য ৯০ মিনিট

নির্ধারিত সময়ে বলের দখল, শট, কর্নার—সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল স্পেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোলের দেখা না পাওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

এ সময়ও আর্জেন্টিনা মূলত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে। স্পেন ধৈর্য ধরে আক্রমণ চালিয়ে যায়।

১০৬ মিনিটে ইতিহাস

অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে আসে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ডান প্রান্ত দিয়ে নিকো উইলিয়ামস দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে গিয়ে নিচু ক্রস বাড়ান। সেই বল দারুণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস জোরালো শটে জাল কাঁপান।

স্টেডিয়াম মুহূর্তেই স্পেন সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ে। এই এক গোলই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ট্রফি এনে দেয় স্পেনকে।

এনজোর লাল কার্ডে শেষ আশা শেষ

গোল হজমের পর আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ম্যাচ পুরোপুরি স্পেনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

১০ জনের আর্জেন্টিনা শেষ কয়েক মিনিটে আর কোনো উল্লেখযোগ্য সুযোগই তৈরি করতে পারেনি।

May be an image of soccer, football and text

শেষ বাঁশির পর দুই ভিন্ন ছবি

রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার। লিওনেল মেসি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরলেও হতাশা লুকাতে পারেননি।

অন্যদিকে স্পেনের খেলোয়াড়রা জাতীয় পতাকা নিয়ে পুরো মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। ট্রফি হাতে অধিনায়কের উল্লাসে যোগ দেয় হাজারো স্প্যানিশ সমর্থক।

May be an image of soccer, football, crowd and text

নতুন যুগের সূচনা

ইউরো জয়ের পর বিশ্বকাপও নিজেদের করে নিয়ে স্পেন জানিয়ে দিল, বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্ব এখন তাদের হাতেই।

তরুণ লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস, রদ্রি এবং ফেরান তোরেসকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই দল আগামী কয়েক বছর বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

May be an image of soccer, football and text

আর্জেন্টিনার জন্য শিক্ষা

এই হার আর্জেন্টিনার জন্য শুধু একটি পরাজয় নয়, একটি যুগের সমাপ্তির প্রতীকও হতে পারে। নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের ঘিরে আবারও দল পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে তাদের সামনে।

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ হলো অশ্রুতে।

আর স্পেন?

তারা শুধু একটি ট্রফি জেতেনি। তারা ঘোষণা দিয়েছে—বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজা এখন লা রোজা।

ক্রীড়া জগৎ সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ