প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি কেবল একটি ক্যাম্পাস-সংঘাত নয়; এটি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রক্টর অফিস থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, এমনকি অ্যাম্বুলেন্স থেকে আহত ব্যক্তিকে নামিয়ে আবারও মারধরের অভিযোগ— প্রতিটি ঘটনাই সভ্য শিক্ষাঙ্গনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি স্থান, যেখানে মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত যুক্তি, নীতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু যদি কোনো অভিযোগের বিচার করার দায়িত্ব ছাত্রসংগঠন বা অন্য কোনো গোষ্ঠী নিজের হাতে তুলে নেয়, তাহলে সেটি আইনের শাসনের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর— কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নয়।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘ট্যাগিং’। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অতীতে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ, ছাত্রদল কিংবা ছাত্রশিবির পরিচয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, নির্যাতন বা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকার পরিবর্তন হলেও যদি একই ধরনের সংস্কৃতি শুধু নতুন পরিচয়ে ফিরে আসে, তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। ব্যক্তি কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটি তদন্তসাপেক্ষ বিষয়; কিন্তু সেই পরিচয়কে কেন্দ্র করে গণপিটুনি বা সামাজিক বিচারের সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতিতে ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদি নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন উপস্থিত থেকেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাবোধ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে ক্লাস করতে, গবেষণা করতে এবং মত প্রকাশ করতে পারেন— সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ, দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। কারা মারধরে জড়িত ছিলেন, কারা উসকানি দিয়েছেন, প্রশাসনের কোথায় ব্যর্থতা ছিল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কতটা যথাযথ ছিল— সবকিছুই স্বচ্ছভাবে তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কোনো পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং প্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেল— শিক্ষাঙ্গনে ‘মব জাস্টিস’ বা গণবিচারের কোনো স্থান নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও সংঘাতের চক্রে আটকে পড়বে। মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় তার জ্ঞানচর্চা, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের পরিবেশে। সেই পরিবেশ রক্ষা করা এখন শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নয়, দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।