• ঢাকা বুধবার
    ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

ধ্বংসস্তূপে জীবন-মৃত্যুর লড়াই: কলম্বিয়ার ভূমিকম্প আমাদের কী শিক্ষা দেয় ?

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১০:৪০ এএম

ধ্বংসস্তূপে জীবন-মৃত্যুর লড়াই: কলম্বিয়ার ভূমিকম্প আমাদের কী শিক্ষা দেয় ?

সম্পাদকীয়

কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত শত শত মানুষের মৃত্যু এবং হাজারো মানুষের আহত হওয়ার খবর বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—ভূমিকম্প নিজে যতটা ভয়ংকর, দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অনেক সময় তার চেয়েও বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ২৫৪ জনে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে দ্বিতীয় রাতেও অভিযান অব্যাহত ছিল।  

এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে মানবিক দিক হলো—ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত মানুষ থাকার সম্ভাবনা। তাই উদ্ধারকর্মীদের প্রতিটি মিনিট এখন মূল্যবান। কোথাও দমকলকর্মী, কোথাও সেনা, আবার কোথাও সাধারণ মানুষ নিজের হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজন বা প্রতিবেশীকে খুঁজছেন। উদ্ধার অভিযানের প্রথম কয়েক ঘণ্টা ও দিনগুলোতে এমন দৃশ্য বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?

কলম্বিয়ার এই ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভবনের মধ্যে বসবাস করেন। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে শুধু ভবন ধস নয়—সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হওয়া, হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং উদ্ধারকারী দলের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারার মতো একাধিক সংকট একসঙ্গে তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ভূমিকম্প কখন হবে—এটি নয়; বরং ভূমিকম্প হলে আমরা কতটা প্রস্তুত। ভূমিকম্পের সময় ও স্থান নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলে দেওয়ার সক্ষমতা এখনো বিজ্ঞানের হাতে নেই। কিন্তু ঝুঁকি কমানোর অনেক উপায়ই আমাদের হাতে রয়েছে। ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা, নিয়মিত মহড়া, জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া—এসবই প্রাণহানি কমাতে পারে।

কলম্বিয়ার এবারের দুর্যোগে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—উদ্ধার ব্যবস্থার সমন্বয়। বড় দুর্যোগের সময় শুধু দমকল বাহিনী বা সেনাবাহিনী দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, হাসপাতাল, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক, প্রকৌশলী, বিদ্যুৎ ও গ্যাস কর্তৃপক্ষ এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে একই কমান্ড কাঠামোর অধীনে দ্রুত কাজ করতে হয়। কলম্বিয়াতেও বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার সমন্বয়ের জন্য যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।  

আরেকটি শিক্ষা হলো ভবনের মান। শক্তিশালী ভূমিকম্পে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ অনেক সময় ভূমিকম্পের কম্পন নয়, বরং ভবন ধসে পড়া। অতীতে কলম্বিয়ার ১৯৯৯ সালের ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পেও ভবন ধস ও উদ্ধারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল।  

বাংলাদেশে এ জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। নগর এলাকায় অনুমোদনহীন নির্মাণ, ভবনের নকশা ও নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন, পুরোনো ভবনের ঝুঁকি এবং সরু সড়কের কারণে উদ্ধারকারী গাড়ি প্রবেশের সমস্যা—এসব বিষয় দুর্যোগের সময় বিপদ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ভূমিকম্পের প্রস্তুতি কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের দায়িত্ব নয়; এটি রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় সরকার, ভবন মালিক, প্রকৌশলী এবং সাধারণ নাগরিক—সবার দায়িত্ব।

বিশেষ করে স্কুল, হাসপাতাল, মার্কেট ও বহুতল আবাসিক ভবনের জন্য নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। প্রতিটি ভবনে জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, গ্যাস ও বিদ্যুতের জরুরি সংযোগ বন্ধ করার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ সমাবেশস্থল থাকা উচিত। পরিবারের সদস্যদেরও জানা উচিত—ভূমিকম্পের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কখন ভবন থেকে বের হতে হবে।

তবে প্রস্তুতি মানে শুধু সরকারি পরিকল্পনা নয়। একজন নাগরিকের ঘরেও ছোট একটি জরুরি কিট থাকা উচিত—পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, বাঁশি, পাওয়ার ব্যাংক এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের তথ্যসহ। ভূমিকম্পের পর মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল বা অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে যেতে পারে; তাই পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই যোগাযোগের বিকল্প পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

কলম্বিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আরেকটি কঠিন বাস্তবতা দেখাচ্ছে—দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও সংকট শেষ হয় না। আহতদের চিকিৎসা, গৃহহীন মানুষের আশ্রয়, পানি ও খাবার সরবরাহ, মানসিক সহায়তা, শিশুর নিরাপত্তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ—সবকিছুই দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। ভূমিকম্পের পরপরই তাই শুধু মৃতের সংখ্যা গোনা নয়, বেঁচে যাওয়া মানুষের জীবন পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও জরুরি।

কলম্বিয়ার এই ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতদের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। কিন্তু শুধু সমবেদনা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি বড় ভূমিকম্পের পর আমাদের উচিত নিজেদের প্রস্তুতি নতুন করে মূল্যায়ন করা। ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু ভূমিকম্পকে গণবিপর্যয়ে পরিণত হওয়া অনেকাংশেই ঠেকানো সম্ভব।

আজ কলম্বিয়ার ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকর্মীরা জীবন খুঁজছেন। আগামীকাল একই পরিস্থিতি যেন আমাদের শহরের কোনো ভবনের নিচে তৈরি না হয়—এখনই সেই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। দুর্যোগের পর উদ্ধার নয়, দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতিই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

সম্পাদকীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ