• ঢাকা বুধবার
    ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
আজ বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ

দিনের আলোয় অন্ধকার নামবে ইউরোপে, মহাকাশের বিরল এক দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবী

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৯:০০ এএম

দিনের আলোয় অন্ধকার নামবে ইউরোপে, মহাকাশের বিরল এক দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই মহাকাশের বিরল এক দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবী। বুধবার (১২ আগস্ট) ঘটতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাগুলোর একটি—পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। এ সময় সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করবে এবং চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের পুরো চাকতিকে ঢেকে দেবে। ফলে পূর্ণগ্রাসের সরু পথে কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো অনেকটাই স্তিমিত হয়ে অন্ধকার নেমে আসবে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এবারের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পথ উত্তর রাশিয়া থেকে শুরু হয়ে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তর স্পেন এবং পর্তুগালের ছোট একটি অংশ অতিক্রম করবে। 

বিশেষ গুরুত্বের বিষয় হলো, ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের কোনো অংশে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। ফলে স্পেনের উত্তরাঞ্চল ও আইসল্যান্ডসহ গ্রহণপথের বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছেন। পর্যটক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, আলোকচিত্রী ও মহাকাশপ্রেমীরা বিরল এই মুহূর্ত সরাসরি দেখার জন্য বিভিন্ন পর্যবেক্ষণস্থলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

পূর্ণগ্রাসের সবচেয়ে দীর্ঘ পর্যায়টি হবে উত্তর আটলান্টিকের ওপর। সেখানে চাঁদ সর্বোচ্চ প্রায় ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড সূর্যকে পুরোপুরি আড়াল করে রাখবে। তবে গ্রহণপথের সব জায়গায় এত দীর্ঘ সময় পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে না। নাসার হিসাবে, অধিকাংশ স্থানে পূর্ণগ্রাসের স্থায়িত্ব দুই মিনিটেরও কম; গ্রহণপথের কেন্দ্রের কাছাকাছি গ্রিনল্যান্ড, রাশিয়া ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে সময়টি দুই মিনিটের কিছু বেশি হবে। 

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রহণের দৃশ্য হবে ভিন্ন। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে স্থানীয় সময় বিকেল প্রায় ৫টা ৪৮ মিনিটে পূর্ণগ্রাস শুরু হবে এবং প্রায় এক মিনিট স্থায়ী হবে। স্পেনের লেয়নে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিটে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়ে প্রায় দুই মিনিট স্থায়ী হবে। ভ্যালেন্সিয়ায় পূর্ণগ্রাস শুরু হবে রাত ৮টা ৩২ মিনিটে। অন্যদিকে মাদ্রিদে পূর্ণগ্রাস নয়, প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত সূর্য ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাবে। 

পর্তুগালের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট একটি অংশও পূর্ণগ্রাসের পথে পড়েছে। ইউরোপের আরও বিস্তৃত এলাকায় আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে সূর্যের একটি বড় অংশ চাঁদের আড়ালে চলে যাবে। তবে এসব অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ পূর্ণগ্রাসের পরিবর্তে আংশিক গ্রহণই দেখতে পারবেন। 

গ্রহণটি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ৯টা ৩৪ মিনিটে শুরু হবে। তবে এই সময়কে বাংলাদেশের আকাশে গ্রহণ শুরু হওয়ার সময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ১২ আগস্টের এই সূর্যগ্রহণ বাংলাদেশ থেকে দৃশ্যমান হবে না। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রহণটির কোনো পর্যায়ই দেখা যাবে না। 

বিশ্বব্যাপী গ্রহণের প্রথম আংশিক পর্যায় শুরু হবে ১৫:৩৪:১৫ ইউটিসিতে, পূর্ণগ্রাসের প্রথম পর্যায় শুরু হবে ১৬:৫৮:০৯ ইউটিসিতে, সর্বোচ্চ গ্রহণ হবে ১৭:৪৬:০৬ ইউটিসিতে এবং শেষ পূর্ণগ্রাস শেষ হবে ১৮:৩৪:০৭ ইউটিসিতে। পুরো পৃথিবীজুড়ে আংশিক গ্রহণের শেষ পর্যায় শেষ হবে ১৯:৫৭:৫৭ ইউটিসিতে। তবে এগুলো বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের সময়; কোনো একটি নির্দিষ্ট শহরের স্থানীয় সময় নয়। 

কেন হয় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ?
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের আলোকে আংশিক বা পুরোপুরি আড়াল করে। পূর্ণগ্রাসের ক্ষেত্রে চাঁদের ছায়ার সবচেয়ে গাঢ় অংশ—যাকে ‘আমব্রা’ বলা হয়—পৃথিবীর যে সরু অঞ্চলের ওপর পড়ে, সেখান থেকেই সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।

পৃথিবী থেকে সূর্য ও চাঁদের আকার প্রায় একই রকম দেখানোর কারণে এই অসাধারণ ঘটনা সম্ভব হয়। বাস্তবে সূর্য চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড় এবং পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ গুণ দূরে; এই আপাত আকারের আশ্চর্যজনক সামঞ্জস্যের কারণেই চাঁদ কখনো কখনো সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিতে পারে।

পূর্ণগ্রাসের কয়েক মিনিটে সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ পুরোপুরি আড়াল হয়ে যায়। তখন দিনের আকাশ অস্বাভাবিকভাবে অন্ধকার হয়ে আসে, তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে এবং সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা খালি চোখে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে পূর্ণগ্রাসের আগে ও পরে সূর্যের দিকে সরাসরি তাকানো নিরাপদ নয়। 

বৃষ্টির শঙ্কায় উদ্বিগ্ন দর্শনার্থীরা
এবারের গ্রহণ দেখার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যবেক্ষণস্থলে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হলেও আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে স্পেনের উত্তরাঞ্চল, আইসল্যান্ড ও অন্যান্য গ্রহণপথে মেঘ বা বৃষ্টির কারণে সরাসরি সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই অনেক পর্যটক এক জায়গায় না থেকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী শেষ মুহূর্তে পর্যবেক্ষণস্থল পরিবর্তনের পরিকল্পনাও করছেন। 

এই গ্রহণকে কেন্দ্র করে শুধু পর্যটন নয়, বিশেষ বিমান ও চার্টার ফ্লাইটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান আকাশের ওপর থেকে মেঘের বাধা এড়িয়ে গ্রহণ দেখার বিশেষ অভিজ্ঞতা বিক্রি করছে। 

বিজ্ঞানীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ শুধু সাধারণ দর্শকদের জন্য রোমাঞ্চকর কোনো মহাজাগতিক দৃশ্য নয়; বিজ্ঞানীদের কাছেও এটি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ চাঁদের আড়ালে চলে গেলে করোনার তুলনামূলক স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়। সূর্যের বায়ুমণ্ডল, সৌর ক্রিয়াকলাপ এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রহণের প্রভাব নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালানো যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যালোক হঠাৎ কমে যাওয়ায় স্থানীয় বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনসহ কিছু স্বল্পমেয়াদি প্রভাব তৈরি হতে পারে। ফলে গ্রহণের সময়টি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও সৌর বিকিরণের পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যবেক্ষণেরও একটি প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার তৈরি করে।

কতটা বিরল এই ঘটনা?
পৃথিবীতে প্রতিবছর সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি সূর্যগ্রহণ ঘটে। কিন্তু এগুলোর সবই পূর্ণগ্রাস নয়। পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে গড়ে প্রায় ১৮ মাস পরপর ঘটলেও নির্দিষ্ট একটি জায়গা থেকে তা দেখা অত্যন্ত বিরল। নতুন গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর একই নির্দিষ্ট স্থানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাওয়ার গড় ব্যবধান কয়েক শত বছর পর্যন্ত হতে পারে। 

সর্বশেষ এমন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ বিশ্ববাসী দেখেছিল ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল, যখন মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অতিক্রম করেছিল চাঁদের পূর্ণ ছায়া। দুই বছরের কিছু বেশি সময় পর আবারও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ পূর্ণগ্রাসের অভিজ্ঞতা পেতে যাচ্ছেন। তবে এবার গ্রহণের কেন্দ্রীয় মঞ্চ উত্তর আটলান্টিক, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল।

আজকের এই মহাজাগতিক দৃশ্য তাই শুধু কয়েক মিনিটের অন্ধকার নয়; এটি সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর নিখুঁত মহাজাগতিক অবস্থানের এক বিরল প্রদর্শন। আর ১৯৯৯ সালের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রথম পূর্ণগ্রাস হওয়ায় এবারের গ্রহণ জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পর্যটন—দুই ক্ষেত্রেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

তবে সূর্যগ্রহণ দেখার সময় নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণগ্রাসের বাইরে সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকানো উচিত নয়। গ্রহণ দেখার জন্য অনুমোদিত সোলার ভিউয়ার বা নিরাপদ সৌর ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ সানগ্লাস, ক্যামেরা ফিল্টার বা অন্যান্য অনিরাপদ কাচ ব্যবহার করে সূর্যের দিকে তাকানো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, কেবল পূর্ণগ্রাসের সেই অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে, যখন চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল মুখ পুরোপুরি ঢেকে দেয়, চোখের সুরক্ষা ছাড়া সরাসরি তাকানো নিরাপদ। 


 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ