প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
একটি সংখ্যা কখনোই একটি মানুষের জীবনকে ধারণ করতে পারে না। এক হাজার মৃত্যু—শুনতে হয়তো একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু সেই সংখ্যার প্রতিটি অঙ্কের পেছনে আছে একটি পরিবার, একজন মা-বাবা, একজন সন্তান, একজন স্বামী বা স্ত্রী, একজন প্রিয়জন। আর যখন বলা হয়—আরও ৪ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ—তখন সেই সংখ্যার প্রতিটি মানুষের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে একেকটি পরিবার, যারা এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, ফোনের অপেক্ষায় আছে, অথবা ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে একটি পরিচিত মুখ খুঁজছে।
নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা প্রকৃতির সেই নির্মম রূপ আবারও সামনে এনেছে, যার কাছে মানুষের প্রস্তুতি অনেক সময়ই অসহায় হয়ে পড়ে। পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও বন্যার স্রোত মুহূর্তের মধ্যে জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য প্রাণ। রেখে গেছে ধ্বংসস্তূপ, শোক আর অনিশ্চয়তা।

কিন্তু এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় সম্ভবত নিখোঁজ মানুষদের গল্প। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্বজনেরা আশা ছাড়তে পারেন না। একটি শব্দ, একটি ভিডিও, একটি ফোনকল—যেকোনো কিছুই তাদের কাছে হয়ে উঠতে পারে প্রিয়জন ফিরে পাওয়ার শেষ আশার আলো।
পাঁচ বছর বয়সী মানিশা মাগারের ঘটনাটি সেই আশারই প্রতীক। ভয়াবহ বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার পর তাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে তার বাবা-মা মেয়েকে উদ্ধারের একটি ভিডিও দেখতে পান। ধ্বংসের মধ্যেও এমন একটি মুহূর্ত প্রমাণ করে—উদ্ধার অভিযান শুধু মানুষকে বাঁচানোর কাজ নয়; কখনো কখনো এটি একটি পরিবারকে আবার বাঁচার কারণও ফিরিয়ে দেয়।

এই দুর্যোগে আরেকটি সাহসের নাম প্রিয়া অধিকারী। নেপালের প্রথম নারী হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে এক সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় ১০০টি উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা জানা গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেখানে স্থলপথ প্রায় অচল, সেখানে আকাশপথে পৌঁছে মানুষকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
তবে প্রশ্নও থেকে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা কতটা প্রস্তুত? পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি কোথায় বেশি—তা কি যথেষ্টভাবে চিহ্নিত? আকস্মিক বন্যার আগাম সতর্কবার্তা কি মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছায়? বিপজ্জনক এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর পরিকল্পনা কি রয়েছে? আর দুর্যোগের পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, জনবল ও সরঞ্জাম কি পর্যাপ্ত?
প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। কিন্তু বিপর্যয়ের মাত্রা কতটা ভয়াবহ হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে মানুষের প্রস্তুতির ওপর।
তাই এই মুহূর্তে শুধু উদ্ধার অভিযান চালালেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নিখোঁজদের সন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে। নিহতদের পরিচয় দ্রুত শনাক্ত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে।

আর দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসতি, সড়ক নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার আচরণ যখন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন পুরোনো প্রস্তুতি দিয়ে নতুন বাস্তবতার মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
নেপালের পাহাড়ে আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু মানুষ নয়—অনেক পরিবারের স্বপ্নও চাপা পড়ে আছে। তবু উদ্ধারকারীরা যখন ধ্বংসস্তূপ সরান, হেলিকপ্টার নিয়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছান, কিংবা স্রোতের মধ্যে কাউকে জীবিত খুঁজে পান—তখন মানবতার জয় হয়।
হাজার মৃত্যু আমাদের শোকাহত করে। কিন্তু সাড়ে চার হাজারের বেশি নিখোঁজ মানুষ আমাদের আরও বেশি অপেক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই অপেক্ষা যেন বৃথা না যায়।

যতক্ষণ একজন মানুষ নিখোঁজ, ততক্ষণ উদ্ধার অভিযান থামার কোনো কারণ নেই। যতক্ষণ একটি পরিবার তার প্রিয়জনের ফেরার আশায় অপেক্ষা করছে, ততক্ষণ রাষ্ট্র, সমাজ ও উদ্ধারকারীদের দায়িত্ব শেষ হয়নি।
নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়—এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতির শক্তিকে হয়তো থামানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতি, প্রযুক্তি ও মানবিকতার শক্তিতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যায়।