• ঢাকা রবিবার
    ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩

রোহিঙ্গা সংকট: মানবিকতার গণ্ডি পেরিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ১০:১৬ পিএম

রোহিঙ্গা সংকট: মানবিকতার গণ্ডি পেরিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি

সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল একটি মানবিক বিপর্যয়ের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার আশ্রয় বাংলাদেশের ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, তা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। একই সঙ্গে সংকটের দীর্ঘায়িত হওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিষয়টির এই বাস্তবতাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। রোববার রাজধানীর বিআইআইএসএস অডিটোরিয়ামে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি যথার্থই বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটকে এখন আর শুধু ‘সংকট ব্যবস্থাপনা’র দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন নতুন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কৌশল নির্ধারণ।

রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি - NewsNow24

প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধের বড় উদাহরণ। কিন্তু একটি দেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকাল ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বহন করা বাস্তবসম্মত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অপরাধ, মাদক পাচার, মানবপাচার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা কিংবা সীমান্তকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বিলম্বিত হওয়ার অর্থ শুধু একটি মানবিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করা নয়; বরং সম্ভাব্য নিরাপত্তা সংকটকেও আরও জটিল করে তোলা।

রোহিঙ্গা সমস্যা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় | NTV Online

তবে এর স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করা নয়। সমাধানের মূল পথ অবশ্যই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আর সেই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এমন একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা নিজেদের জীবন, সম্পদ ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

এখানেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে চলে না যায়। জাতিসংঘ, প্রভাবশালী রাষ্ট্র, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু ত্রাণ সহায়তা দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধানের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন উদ্যোগ

বাংলাদেশের জন্যও এখন সময় এসেছে কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক করার। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়েও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে সংকটের সুযোগ নিয়ে কোনো অপরাধী বা উগ্র গোষ্ঠী তাদের ব্যবহার করতে না পারে। পাশাপাশি কক্সবাজারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, সেদিকেও আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশের স্বার্থের বিষয় নয়। এটি মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই এ সংকটকে ‘বাংলাদেশের সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী | Dainik  Provat

সময় যত গড়াবে, প্রত্যাবাসন তত কঠিন হবে। নতুন প্রজন্মের রোহিঙ্গারা শিবিরেই বড় হচ্ছে; তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও বাড়ছে। তাই এখনই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তার স্বীকৃতি শুধু প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এই মানবিক দায়িত্ব পালনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনে রূপ দিতে হবে। কারণ রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ত্রাণের পরিমাণ বাড়ানোর মধ্যে নয়—সমাধান নিহিত নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে।

রোহিঙ্গা সংকটকে আর সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর উদ্যোগ, সাময়িক ব্যবস্থাপনার চেয়ে স্থায়ী সমাধান এবং মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

আর্কাইভ