প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২৬, ০৮:২০ এএম
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, ১০ আগস্ট পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ীও দেশের রিজার্ভ এখন ৩২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণও ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৯৬১ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৪৫ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলারে।
দুই হিসাবের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। তবে এ ব্যবধানকে রিজার্ভের অসামঞ্জস্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ গ্রস রিজার্ভের হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ও দায়ের উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে, আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে এমন রিজার্ভকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক লেনদেন ও বৈদেশিক দায় পরিশোধে তুলনামূলকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিমাপযোগ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ বাড়ায়। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লে ডলারের সরবরাহও বাড়ে, যা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত পদক্ষেপ এবং ডলার বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতাও রিজার্ভ পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে ডলারের উচ্চ চাহিদা ও সরবরাহ সংকট দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি করেছিল। সেই চাপ কিছুটা কমলে রিজার্ভ ধরে রাখা এবং বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির এই প্রবণতা কতটা টেকসই হবে, সেটি নির্ভর করবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি আমদানি ব্যয় ও ডলার চাহিদার ওপর।
বিপিএম৬ রিজার্ভ কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রে বিপিএম৬ হিসাবটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের Balance of Payments and International Investment Position Manual, Sixth Edition (BPM6) অনুযায়ী হিসাব করা এই রিজার্ভ আন্তর্জাতিকভাবে তুলনাযোগ্য।
গ্রস রিজার্ভের অঙ্ক বড় হলেও এর সবটুকু একইভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। বিভিন্ন দায়, তহবিল বা অন্যান্য উপাদানের কারণে মোট রিজার্ভ এবং প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের মধ্যে পার্থক্য থাকে। ফলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা, আমদানি ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়নে বিপিএম৬ হিসাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমানে বিপিএম৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার হওয়াকে বৈদেশিক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শুধু রিজার্ভের অঙ্ক বাড়লেই অর্থনীতির বৈদেশিক খাত পুরোপুরি চাপমুক্ত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
রিজার্ভের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে আমদানি ব্যয়, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ এবং ডলারের অভ্যন্তরীণ চাহিদা—সবকিছুই রিজার্ভের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লে রিজার্ভে চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ শক্তিশালী হয়। একইভাবে বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহও নির্দিষ্ট সময়ে রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সাম্প্রতিক রিজার্ভ বৃদ্ধিকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হলেও অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে মূল বিষয় হবে এই প্রবৃদ্ধি কতটা ধারাবাহিক এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য কতটা টেকসইভাবে উন্নত হচ্ছে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
রিজার্ভের অবস্থান শক্তিশালী হলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আস্থা বাড়তে পারে। এতে ডলারের বাজারে অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানো এবং আমদানি দায় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের ক্ষেত্রেও স্বস্তি তৈরি হয়।
রিজার্ভের উন্নতি মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হলে বিনিময় হারের ওপর চাপ কমতে পারে। এর প্রভাব আমদানিনির্ভর ব্যবসা, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
তবে এসব ইতিবাচক প্রভাব স্থায়ী করতে হলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।
এখন নজর রিজার্ভের ধারাবাহিকতায়
সব মিলিয়ে, ১০ আগস্ট পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ হিসাবে ৩২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো দেশের বৈদেশিক খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে এই অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আগামী দিনে রেমিট্যান্সের প্রবাহ, রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, ডলারের বাজারের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ—এই সূচকগুলোর গতিপথই নির্ধারণ করবে রিজার্ভের পরবর্তী অবস্থান। ফলে সাময়িকভাবে রিজার্ভ বাড়ার চেয়ে বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয়ের কাঠামোগত ভারসাম্য তৈরি এবং ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।