প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১০:২১ এএম
ব্রিকসের ১১ সদস্যের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করার কথা রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংও দুই দিনের এই সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তির প্রকাশ করা ভিডিওতে পুতিনকে দিল্লির পালাম বিমানঘাঁটিতে নামতে দেখা গেছে। সেখানে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং তাকে স্বাগত জানান।
শি চিনপিংয়ের এবারের ভারত সফরও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম তিনি ভারত সফর করছেন। ছয় বছর আগে হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্তে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়।
সেই সময় থেকে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়ে ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক আবারও কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল, ভিসাব্যবস্থা এবং উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ চালু হচ্ছে। তবে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসও রয়েছে। এর সঙ্গে ভারতের সঙ্গে চীনের বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি এবং এশিয়ায় দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।
শুক্রবার ব্রিকস সম্মেলনকে সামনে রেখে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাস্যোজ্জ্বল পোস্টার দেখা গেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
মধ্য দিল্লির বেশ কয়েকটি এলাকায় যান চলাচলের ওপরও কঠোর বিধি-নিষেধ দেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ বাসিন্দাদের ধৈর্য ধরার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিকস ২০০৯ সালে একটি জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। বিশ্বের বড় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে সদস্য দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানো। শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে জোটটি গঠিত হয়। পরে এর সদস্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও জোটটির সদস্য। তবে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর ব্রিকসের ভেতরে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যও বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশগুলোর অবস্থানে বড় পার্থক্য রয়েছে।
ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক হর্ষ ভি পান্ত বলেন, এবারের ব্রিকস সম্মেলনে উপসাগরীয় সংঘাত সবচেয়ে বড় মতবিরোধের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, গত বছর পর্যন্ত ব্রিকসের সম্প্রসারণকে জোটটির সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও এখন সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের এটিই প্রথম ভারত সফর। তার সফরের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবারের ব্রিকস আলোচনায় আরো বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের শিলান শাহ বলেন, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ব্রিকসের সম্প্রসারিত সদস্যদের মধ্যে ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান, গত মে মাসে দিল্লিতে বৈঠক করেও ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি। এতে জোটটির ভেতরে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েল- দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখছে নয়াদিল্লি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে ভারতকে সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ভারত আংশিকভাবে রাশিয়ার দিকে আরো ঝুঁকেছে। রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পর রাশিয়া ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ জ্বালানি সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনাও রয়েছে।
পুতিন এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন। তবে চলতি মাসেই কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠক হয়েছে। অন্যদিকে চলতি মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর ইউক্রেন সফর করেন। সফরের সময় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধ বন্ধে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করেন। জেলেনস্কি বলেন, এই ‘অন্যায্য যুদ্ধ’ বন্ধে ভারতের প্রতিশ্রুতির জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।