প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম
বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব আবারও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু কাজ হয়নি। তার কূটনৈতিক তৎপরতায় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তার পেছনে দায়ী। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে কঠোর ভাষণের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প, কিন্তু তাতেও বড় কোনো অগ্রগতি আসেনি। যা ব্যর্থতা তুল্য।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে রাজি না হলে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দেন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে তার কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের মাল পায়।’ আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিতও দেন তিনি।
তবে তার এমন কঠোর অবস্থানের বিপরীতে বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছ থেকে প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের অনেকেই ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিশ্বকে ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি শক্তি ও জবরদস্তির পরিবর্তে ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’-এর পক্ষে অবস্থান নেন।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, তার দেশের জলসীমায় বিমানবাহী রণতরী নয়, বরং অপরাধে অর্থ ও অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ করতে সহযোগিতা প্রয়োজন।
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে মিলে শুরু হওয়া এই সংঘাত প্রায় সাত মাস ধরে চলছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং সংঘাত ইয়েমেন ও লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনসমর্থনেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৃহস্পতিবারের বৈঠকেও ট্রাম্পের জন্য বড় কোনো সাফল্য আসেনি। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্যেও আলোচনার সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল ছিল দুই দেশের বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাইওয়ান ইস্যু ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি।
ট্রাম্পের আগের শুল্কনির্ভর কঠোর নীতির তুলনায় এবার তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিল। এর পেছনে চীনের বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বড় কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। প্রযুক্তি ও গাড়ি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এসব খনিজের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধেও ট্রাম্পের উদ্যোগ খুব একটা সফল হয়নি। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত পরিসরের জ্বালানি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি।
গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের ব্যবধান দেখা গেছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হলেও এটি ট্রাম্পের আগের ‘মালিকানা’ নেওয়ার দাবির তুলনায় অনেক সীমিত।
এদিকে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ঝুঁকিতে থাকায় নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আরও সীমিত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার বলেন, এক বছর আগে খুব কম দেশই ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করার সাহস দেখাত। এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তাকে ‘না’ বলতে বেশি আগ্রহী।
তবে হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি থমকে যাওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প ‘লোক দেখানো অবস্থান নিয়ে চিন্তিত নন, বরং ফলাফল নিয়ে চিন্তিত’। তার দাবি, বিশ্বনেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় তাদের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে।