• ঢাকা শুক্রবার
    ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩

ভারতের রাফাল ধ্বংসকারী সেই যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধা

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

ভারতের রাফাল ধ্বংসকারী সেই যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধা

সিটি নিউজ ডেস্ক

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে ভারত যে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল তার জের ধরে দেশটির অন্তত পাঁচটি যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি ইসলামাবাদের।

ভারতের পাঁচটি জেট ফাইটার ভূপাতিত করার কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে প্রথম বলেন পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার।

তবে তিনি তখন এর বেশি কিছু বিস্তারিত জানাননি। যদিও পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগের (আইএসপিআর) মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করেন, ভারতের পাঁচটি ভূপাতিত বিমানের মধ্যে তিনটি অত্যাধুনিক রাফাল, একটি সুখোই ও একটি মিগ-২৯।

বিবিসি ভেরিফায়েড জানিয়েছিল, ভারতের পাঞ্জাবের একটি কৃষিক্ষেতে রাফাল যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ পড়েছিল এবং সেনা সদস্যরা সেগুলো সরানোর কাজে যুক্ত ছিল।

ফ্রান্সের ডাসোঁ অ্যাভিয়েশনের তৈরি রাফাল হলো ভারতীয় বিমানবাহিনীর সম্ভারে সবচেয়ে আধুনিক ও বিধ্বংসী যুদ্ধবিমান।

রাফালকে ধ্বংস করতে পাকিস্তান ব্যবহার করেছিল চীন থেকে কেনা ‘জে-১০ সি ই’ যুদ্ধবিমান। আর সেই যুদ্ধবিমান বাংলাদেশ কিনতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে বাংলাদেশ প্রথম যে যুদ্ধবিমান কিনেছিল এর আনুষ্ঠানিক নাম এফ-৬। ১৯৭৭ সালে চীন থেকে এসব যুদ্ধবিমান কিনেছিল বাংলাদেশ।

ঢাকার বিজয়স্মরণী থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে গেলে রাস্তার মোড়ে মাঝারি আকারের যে যুদ্ধবিমান চোখে পড়ে, সেটি এ ধরনের বিমান। বিমানটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর একে উন্মুক্ত প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়।

আনুষ্ঠানিক নাম এফ-৬ হলেও চীনে বিমানটি পরিচিত জে-সিক্স নামে।

বাংলাদেশ এখন চীন থেকে আধুনিক প্রযুক্তির নতুন যেসব যুদ্ধবিমান কিনতে যাচ্ছে সেটার নাম অবশ্য জে-টেন সি ই।

সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে আলোচিত এ যুদ্ধবিমানটি দিয়েই পাকিস্তান তার প্রতিপক্ষ ভারতের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রাফাল বিমান ভূপাতিত করার দাবি করে।

রাফাল ভূপাতিত করার দাবি নিয়ে সেসময় আলোচনা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও চীনের জে-টেন বিমান নিয়ে খবর-বিশ্লেষণ উঠে আসে।

বাংলাদেশ এখন যে তার বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের কথা বলছে, সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চীনের এই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান জে-টেন কেনার উপর।

বলা হচ্ছে, ইতোমধ্যেই এই বিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের পরিকল্পনায় শুধু কি যুদ্ধবিমানই যথেষ্ট?

আকাশ প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ, যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবকাঠামো বিবেচনায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

আর চীনের এ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতায় কতটা পরিবর্তন আনবে?

বাংলাদেশের প্রথম যুদ্ধবিমান কোন দেশের?

বাংলাদেশ ১৯৭৭ সালে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনে এটা ঠিক। তবে দেশটির প্রথম যুদ্ধবিমানের বহর এসেছিল আরও কয়েকবছর আগে ১৯৭৩-৭৪ সালে।

তখন বাংলাদেশকে বিনামূল্যে যুদ্ধবিমান উপহার হিসেবে দিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন।

সেটা ছিল তখনকার অত্যাধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমান মিগ-২১।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, এগুলো ছিল একেবারে ফ্যাক্টরি ফ্রেশ। কারখানা থেকে বের হয়েই আমরা পেয়েছিলাম। মানে রাশান বিমানবাহিনীর বাইরে আমরাই প্রথম পেয়েছিলাম। এমনকি ভারতও আমাদের কয়েকবছর পর মিগ-২১ পেয়েছিল। তখনকার এই অত্যাধুনিক বিমান আমাদের এগিয়ে দিয়েছিল অনেক।

তিনি বলেন, শুধু যুদ্ধবিমান নয়, এর সঙ্গে যত ধরনের মিসাইল, বোমা, রকেট- সব আমাদের দিয়েছিল। তখন থেকেই বিমানবহর শুরু হলো বলা যায়। তখন তো আমাদের কিছুই ছিল না। যুদ্ধের পর এয়াফিল্ডগুলো মেরামত হচ্ছিল। এমনকি ব্যাচের পর ব্যাচ প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়া পাঠানো হয়েছিল।

বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে এখন কী আছে?

বাংলাদেশ প্রথম যুদ্ধবিমান পায় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে, সেটা হচ্ছে মিগ-২১।

এরপর বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান সংগ্রহের মূল উৎস পরিবর্তিত হয়ে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

১৯৭৭ সালে চীন থেকে এফ-৬, এরপর আশির দশকে আনা হয় এফ-৭।

বাংলাদেশ এরপরও যুদ্ধবিমান কিনেছে। তবে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে একটা বড় পরিবর্তন আসে ১৯৯৯ সালে।

তখন রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনে বাংলাদেশ। সেগুলো ছিল সেসময়ে পৃথিবীর অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা ফাইটার জেট।

তবে ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বহর বেশ পুরোনো হয়ে পড়েছে। একটা অংশ এখন অচল, আরেকটা অংশ পুরোনো হয়ে অচল হওয়ার পথে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের বিমানবহরে এখন আসলে কী আছে? সরকারিভাবে অবশ্য এর কোন পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না।

তবে সামরিক তথ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশ’ এর হিসেবে এর একটা চিত্র পাওয়া যায়। যেখানে দেখা যায় বাংলাদেশের বিমান বাহিনী বহরে এখন বিমান আছে ২১২টি। এর মধ্যে যুদ্ধ বিমান রয়েছে ৪৪টি।

এই ৪৪টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে রাশিয়ার মিগ-২৯ আছে আটটি। আর চীনের নির্মিত এফ-৭ যুদ্ধবিমান ৩৬টি। এই মডেলগুলো কিছুটা পুরোনো।

এছাড়াও আছে ১৪টি ইয়াক-১৩০ বিমান যেগুলো প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হলেও হালকা আক্রমণ চালানোর উপযোগী। রাশিয়া থেকে বিমানগুলো কেনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।

চীনের এফটি সেভেন প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান, যুক্তরাষ্ট্রের লকহিডের দুটি সিরিজের কৌশলগত পরিবহন বিমানও আছে বাহিনীতে।

বিমানবাহিনীর বহরে ৭৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে বলেও ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশে তথ্য দেওয়া আছে। এর মধ্যে রাশিয়ার এমআই সিরিজের ৩৬টি হেলিকপ্টার আছে।

আর যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত সেসনা, বেলের বিভিন্ন মডেলের হেলিকপ্টার আছে ২৪টি।

এর পাশাপাশি ফ্রান্স, ইতালি, চেকোস্লোভাকিয়া (চেক রিপাবলিক) থেকে কেনা কিছু প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করে বাংলাদেশ।

এছাড়া বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে ৪৪টি ড্রোন রয়েছে বলে জানাচ্ছে ওয়েবসাইটটি। এর মধ্যে ৩৬ টিই স্লোভেনিয়ায় নির্মিত ব্রামর সি ফোর আই।

তুরস্কের তৈরি বায়রাক্তার টিবি টু আছে ছয়টি। গত বছরই এগুলো যুক্ত হয়।

বিমান বাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল এম আবুল বাশার বলেন, বাংলাদেশের মিগ-২৯ একটু আধুনিক। কিন্তু সেটাও এখনকার যুগে পুরনো। এর বাইরে আমাদের বাকি যা আছে সবগুলো আরও পুরনো থ্রি-জি প্রযুক্তির। অথচ এখন যে যুদ্ধ হচ্ছে, সেখানে ফোর পয়েন্ট ফাইভ-জি এমনকি ফাইভ-জি প্রযুক্তির স্টেলথ বিমানও ব্যবহার হচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের বিমানবহর আধুনিকায়ন করার বিকল্প ছিল না। এখন চীন থেকে যে বিমানগুলো আনা হচ্ছে সেগুলো আধুনিক ফোর পয়েন্ট ফাইভ জি প্রযুক্তির।  

শুধু যুদ্ধ বিমান কেনাই কি যথেষ্ট?

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের ২০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ। এগুলোকে বলা হচ্ছে মাল্টিরোল ফাইটার জেট।

অর্থাৎ বিমানগুলো আকাশ প্রতিরক্ষায় একইসঙ্গে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী। যেমন-

এয়ার টু এয়ার সাপোর্ট অর্থাৎ এটি আকাশসীমায় শত্রুবিমানকে প্রতিরোধ করতে ব্যবহার করা যায়।

এয়ার টু গ্রাউন্ড অর্থাৎ শত্রু দেশের মাটিতে কোনো টার্গেট থাকলে সেখানে বোমবর্ষণে দক্ষ।

ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট অর্থাৎ সেনাবাহিনী কোথাও যুদ্ধরত আছে, এই বিমান গিয়ে তাদেরকে সাপোর্ট দিতে পারে। মেরিটাইম এয়ার সাপোর্ট অর্থাৎ সমুদ্রে নৌবাহিনীকে সাপোর্ট দেওয়া।

তিনি আরও বলেন, এই একটা বিমান, যেটা আমরা কিনতে যাচ্ছি, এটা একাই সব ধরনের কাজ করতে পারে।

তিনি এটাও বলেন, আধুনিক যুদ্ধপরিস্থিতিতে শুধু যুদ্ধবিমানই যথেষ্ট নয়। রাডার, জ্যামিং প্রযুক্তি, মিসাইলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া বিমান-নৌ-সেনা অস্ত্র সরঞ্জামের মধ্যে একধরণের ‘রিয়েল টাইম’ সমন্বয়ের উপরও যুদ্ধের সফলতা নির্ভর করছে।

চীনা নির্ভরতার কারণ কী?

বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সামরিক সক্ষমতা তৈরি করতে চায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এর জন্য দেশটি মূলত চীনা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল।

নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে শুরু করে রণতরী কিংবা সেনাবাহিনীর ট্যাংক, সাঁজোয়া যান থেকে শুরু করে আকাশ প্রতিরক্ষা - সবকিছুর বড় অংশটাই আসে চীন থেকে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে সাবমেরিন রয়েছে দু‍‍`টি। দুটিই চীনের তৈরি এবং ২০১৭ সালে এগুলো নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়।

এছাড়া গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে সব মিলিয়ে নৌযান রয়েছে ১১৭টি। এর মধ্যে সাতটি ফ্রিগেট বা রণতরী আছে বাংলাদেশের।

সাথে আরো আছে ছয়টি কর্ভেট যুদ্ধজাহাজ। কর্ভেট জাহাজগুলোর মধ্যে চারটি চীনের, দুটি যুক্তরাজ্যের।

ফ্রিগেটগুলোর চারটির নির্মাতা চীন, দুইটির যুক্তরাষ্ট্র আর একটি দক্ষিণ কোরিয়ার।

কিন্তু চীন কীভাবে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস হয়ে উঠল?

আর্কাইভ