প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
লিওনেল মেসি যেন ক্লান্ত জাহাজী। বহু বছর আর্জেন্টিনা নামক ঐতিহ্যবাহী জাহাজটাকে নিয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগর পাড়ি দিয়েছেন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম, যাত্রা শেষে থামতে হয়। সে নিয়ম মেনে অবশেষে তিনি থেমেছেন। বিদায়ী ম্যাচটাও খেলে ফেলেছেন। এ পথটাই যাওয়া, এর আর কোনো ফিরে আসা নেই।
সোনালী সময়ে তিনি মায়াবি সব ড্রিবলে ছিটকে বেরিয়ে যেতেন বহু ডিফেন্ডারের জটলা থেকে। সে ঝলকটা আজ দেখাতে পারেননি। ক্লান্ত পায়ে তা আর কাহাতক সম্ভব! কিন্তু পুরো ক্যারিয়ার যেভাবে কেটেছে, মাঝদরিয়ায় পথ হারানো আর্জেন্টিনাকে তরিয়েছেন গোল করে, বা করিয়ে; সে কাজটা আজ করতে ভোলেননি। বেনিনের জালে আর্জেন্টিনা জড়াল ৩ গোল, তিনটিতেই আছে মেসির নাম। দুটো করিয়েছেন সতীর্থদের দিয়ে, একটা করলেন। বিদায়ী ম্যাচেও ক্লান্ত জাহাজী মেসির কাঁধেই ছিল আর্জেন্টিনার ভার। তিনি সে কাজটাকে পরিণতি দিয়েছেন সুনিপুণভাবে, পুরো ক্যারিয়ারে যেমন দিতেন।

গোল না পেলেও প্রথমার্ধে দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাটি ছিলেন। প্রতিপক্ষের বিপদসীমায় ৬ বার বল ছুঁয়েছিলেন, এরপর সবচেয়ে ভালো দুই সুযোগের একটা পেয়েছিলেন তিনি, অন্যটা তৈরিও করেছিলেন। তবে শুরুর অর্ধে গোল হলো না।
অচলাবস্থা ভাঙতে তাকে, আর্জেন্টিনাকে অপেক্ষা করতে হয় ম্যাচের ৪৭ মিনিট পর্যন্ত। কর্নার থেকে মেসি তৈরি করেন সুযোগ। গোলটা আসে আরেক ক্লান্ত জাহাজীর পা থেকে, সে জাহাজী নিকলাস ওতামেন্দি।
আর্জেন্টিনার সোনালী প্রজন্মের এই সেনানী সব জয় করেছেন, মেসির সঙ্গে তিনিও আজ বিদায় বলেছেন আকাশি-সাদা জার্সিটাকে। সেই সেন্টারব্যাক তার বিদায় রাঙিয়েছেন গোলটা দিয়ে। তাও এমন এক গোল, যা একজন ফরোয়ার্ড দেখলেও ঈর্ষায় জ্বলে যেতে পারতেন। অনেকটা পেছন থেকে এসে প্রতিপক্ষ রক্ষণে হানা দিয়েছেন, আগে থেকেই লাফিয়ে উঠেছিলেন, বলটা আসতেই আলতো টোকায় জড়িয়েছেন জালে।
-6ac5a6cc2c8fc.jpg)
পরের গোলটার জন্য অপেক্ষা খুব বেশি দীর্ঘ হলো না। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে আসা নিকো পাজকে বলটা বক্সের বাইরে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে দারুণ এক কার্লারে পাজ বল জড়ালেন জালে। ব্যবধান দ্বিগুণ করে আর্জেন্টিনা, মেসির নামের জমা পড়ে আরও এক অ্যাসিস্ট।
বিদায়ী ম্যাচের জন্য এটুকুই ঝলকই তো যথেষ্ট ছিল। কিন্তু মেসি পূর্ণতা দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলেন। ৭০ মিনিটে অগাস্তিন জিয়াই প্রতিপক্ষ বক্সে ফাউলের শিকার হন। পেনাল্টি আসে আর্জেন্টিনার দুয়ারে। জোরালো এক শটে স্পটকিক থেকে বলটা জালে জড়ান মেসি। জোড়া অ্যাসিস্ট আগে থেকেই ছিল। গোলের খাতাতেও নামটা লিখিয়ে মেসি লিখলেন তার মধুরেণ সমাপয়েৎ-এর গল্পটা।
এমন গল্পকে সংখ্যায় রূপ দেওয়াটাই পরিসংখ্যানের কাজ। সোফা স্কোর বলছে, মেসির এই ম্যাচের পারফর্ম্যান্সকে দশে ৮.৫ দেওয়া চলে। পুরো ক্যারিয়ারে এমন সব পারফর্ম্যান্স হরহামেশাই দিয়েছেন। বহু ঝড়ে ফুলে ওঠা জলে পাল ছিঁড়ে যাওয়ার রাতে হুঁশিয়ার কাণ্ডারির মতো, দক্ষ জাহাজীর মতো সামলেছেন আর্জেন্টিনা নামের জাহাজটাকে। আজ তেমন ঝড় না এলেও কায়দাটা ঠিকই দেখালেন, শেষবারের মতো।
কারণ, জাহাজীর কাছে ভীষণ সত্য সে পথটাই যাওয়া, এর আর কোনো ফিরে আসা নেই।