প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ১১:১২ পিএম
দেশের জ্বালানি খাতে গ্যাস সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও সাভারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল সাময়িক ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ লাইন—এসব দৃশ্য সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের বার্তা বহন করছে।

সরকার বলছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামতের কাজ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দিলেই যদি পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের জ্বালানি অবকাঠামো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
বাস্তবতা হলো, দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর যেকোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলেই তার প্রভাব পুরো দেশে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে বলে আসছেন, কেবল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, অফশোর ও অনশোর অনুসন্ধান, বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন এবং শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব এবং সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্প ও অগ্রাধিকারের পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেবা না পেলেও গ্রাহককে নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। অনেক পরিবার গ্যাস না পেয়ে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করছে, ফলে একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল বহন করতে হচ্ছে। শিল্পকারখানাও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়বে।
এই সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। শুধু বর্তমান যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত মেরামত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবসম্মত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থাকা জাতীয় জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিকল্প জ্বালানি উৎসে গুরুত্ব দিতে হবে, এলএনজি অবকাঠামোয় বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

জ্বালানি শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তিই নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও অপরিহার্য অংশ। তাই গ্যাস সংকটকে আর সাময়িক কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের উত্তরও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে।